০৩:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সিদ্দীক কেলিয়ে খোদাকা রাসূল বস

  • মুক্তিধারা
  • Update Time : ০৩:৫৪:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • ১১৪ Time View

আবু বকর সিদ্দিক (রাদ্বি)Abu Bakar Siddique

সিদ্দীক কেলিয়ে খোদাকা রাসূল বস

🖋️ মুহাম্মদ নূরুল আবছার হারূনী
 
মক্কা মুকাররমায় ইসলামের প্রথম শিক্ষা ও প্রচার কেন্দ্র হল সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত দারে আরক্বম; তাতেই রাসূলুল্লাহ (দ.) আপন সাহাবীদের ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষা দিতেন। তখনও মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র ঊনচল্লিশ জন। হযরত সৈয়্যদুনা সিদ্দীকে আকবর (রাদ্বি.) কাফিরদের প্রকাশ্য ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন। হুযূরে আকরম (দ.)’র অনুমতির জন্য সিদ্দীকে আকবর (রাদ্বি.) জোর অনুরোধ জানালে হুযূর (দ.) অনুমতি প্রদান করলেন।
অনুমতি পেয়ে তিনি (রাদ্বি.) উচ্চ আওয়াজে মানুষদের মাঝে বক্তব্য দিতে লাগলেন আর হুযূর (দ.) বসা ছিলেন। (এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশ্য দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আহ্বানকারী প্রথম বক্তা তিনি।) এমতাবস্থায় কাফিররা তাঁর ওপর হামলা করল। এমন বেধড়ক প্রহার করল যে, তাঁর সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেল এবং তাঁকে চেনাই যাচ্ছিলনা। জবুথবু অবস্থা দেখে মৃত ধারণা করে ফেলে গেল। তাঁর গোত্রীয় লোকেরা সংবাদ পেয়ে ঘরে নিয়ে গেলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, যদি তিনি মারা যান তবে অবশ্যই বদলা নেবে।
তাঁর পিতা-মাতা ও গোত্রের লোকেরা অপেক্ষা করছিল যে, কখন হুশ আসবে। নবী-প্রেমের পতঙ্গ সারাদিন বেহুশ ছিলেন। দিন-শেষে হুশ ফিরলে আঁখি মেলেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (দ.) কেমন আছেন?’
গোত্রের সব লোক নাখোশ হয়ে চলে গেল যে, আমরা তো তাঁর চিন্তায় অস্থির, আর সে অন্য কারো চিন্তায় নিমগ্ন রয়েছে! তাঁর মমতাময়ী আম্মা বারংবার তাঁকে কিছুনা কিছু পানাহার করতে সাধাসাধি করছিলেন, আর ওই নবী প্রেমিকের একটিই উত্তর ছিল যে, ‘যতক্ষণ প্রেমাস্পদ রাসূল (দ.) কেমন আছেন? জানতে পারবোনা; ততক্ষণ না কিছু খাব, না পান করব’। কলিজার ঠুকরো ছেলের আকুলতা দেখে মা বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! তোমার মাহবূব সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা যে, তিনি কেমন আছেন?’ 
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাদ্বি.) বললেন, হযরত উম্মে জমীল বিনতে খাত্তাবের নিকট গিয়ে হুযূর (দ.)’র বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে আসুন। তাঁর সম্মানিত জননী উম্মে জমীলের নিকট গিয়ে আবূ বকর (রাদ্বি.)’র অবস্থাদি বললেন। যেহেতু তাঁর ওপর তখনও নিজের ইসলাম গ্রহণের বিষয় গোপন রাখার নির্দেশ ছিল, সেহেতু তিনি বললেন, ‘আমি আবূ বকর (রাদ্বি.) ও তাঁর প্রেমাস্পদ মুহাম্মদ (দ.) কে জানিনা-চিনিনা, তবে তুমি চাইলে আমি অবশ্যই তোমার সাথে তোমার ছেলের কাছে যেতে পারি। অতএব হযরত উম্মে জমীল (রা.) তাঁর জননীর সাথে যখন সৈয়্যদুনা আবূ বকর সিদ্দীক (রাদ্বি.)’র নিকট আসলেন, তাঁর অবস্থা অবলোকনে নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে বলতে লাগলেন, ‘আমি আশা করি যে, আল্লাহ অবশ্যই তাদের থেকে আপনার বদলা নেবে’।
তিনি (রাদ্বি.) বললেন যে, ‘ওইসব রাখ, রাসূলুল্লাহ (দ.) কেমন আছেন? তা-ই বল’। উম্মে জমীল (রাদ্বি.) ইঙ্গিত করলেন যে, আপনার জননী রয়েছে। সিদ্দীক (রাদ্বি.) বললেন, ‘চিন্তা করোনা, শীঘ্র বল’। প্রত্যুত্তরে তিনি (রাদ্বি.) বল্লেন, ‘নিরাপদ ও ভালই আছেন’। আবার জানতে চাইলেন, ‘এখন কোথায়?’ উত্তরে বল্লেন, ‘দারে আরক্বমেই আছেন’। এতদশ্রবণে তিনি (রাদ্বি.) বল্লেন, ‘আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার শপথ! যতক্ষণনা আমি এ চোখে আপন মাহবূব (দ.) কে বহাল তবিয়তে না দেখি, ততক্ষণ না আমি কোন খাবার খাব, না কোন পানীয় পান করব’।
রূপ-সম্‘আ মুস্তফা (দ.)’র ওই পতঙ্গে ধরাধরি করে দারে আরক্বমে নেওয়া হলে, হুযূর (দ.) ওই পাগলপারা প্রেমিককে নিজের দিকে আসতে দেখে, আগ বাড়িয়ে ধরলেন এবং ঝুঁকে চুমু দিলেন। সকল মুসলমানও তাঁর প্রতি ঝুঁকে পড়লেন। তিনি (রাদ্বি.) কে আহত দেখে রাসূলুল্লাহ (দ.) বড়ই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন।
তিনি (রাদ্বি.) আরয করলেন যে, আমার আম্মাজান খেদমতে উপস্থিত, তাঁর জন্য দু‘আ করুন; আল্লাহ যেন তাঁকে ঈমানের দৌলতে ধন্য করেন। তিনি (দ.) দু‘আ করলেন আর তাঁর আম্মা ওখানেই ঈমান রত্মে মর্যাদান্বিত হলেন। (তারীখুল খামীস ১ম খণ্ড ২৯৪ পৃষ্ঠা)। 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

সিদ্দীক কেলিয়ে খোদাকা রাসূল বস

Update Time : ০৩:৫৪:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০

সিদ্দীক কেলিয়ে খোদাকা রাসূল বস

🖋️ মুহাম্মদ নূরুল আবছার হারূনী
 
মক্কা মুকাররমায় ইসলামের প্রথম শিক্ষা ও প্রচার কেন্দ্র হল সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত দারে আরক্বম; তাতেই রাসূলুল্লাহ (দ.) আপন সাহাবীদের ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষা দিতেন। তখনও মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র ঊনচল্লিশ জন। হযরত সৈয়্যদুনা সিদ্দীকে আকবর (রাদ্বি.) কাফিরদের প্রকাশ্য ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন। হুযূরে আকরম (দ.)’র অনুমতির জন্য সিদ্দীকে আকবর (রাদ্বি.) জোর অনুরোধ জানালে হুযূর (দ.) অনুমতি প্রদান করলেন।
অনুমতি পেয়ে তিনি (রাদ্বি.) উচ্চ আওয়াজে মানুষদের মাঝে বক্তব্য দিতে লাগলেন আর হুযূর (দ.) বসা ছিলেন। (এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশ্য দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আহ্বানকারী প্রথম বক্তা তিনি।) এমতাবস্থায় কাফিররা তাঁর ওপর হামলা করল। এমন বেধড়ক প্রহার করল যে, তাঁর সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেল এবং তাঁকে চেনাই যাচ্ছিলনা। জবুথবু অবস্থা দেখে মৃত ধারণা করে ফেলে গেল। তাঁর গোত্রীয় লোকেরা সংবাদ পেয়ে ঘরে নিয়ে গেলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, যদি তিনি মারা যান তবে অবশ্যই বদলা নেবে।
তাঁর পিতা-মাতা ও গোত্রের লোকেরা অপেক্ষা করছিল যে, কখন হুশ আসবে। নবী-প্রেমের পতঙ্গ সারাদিন বেহুশ ছিলেন। দিন-শেষে হুশ ফিরলে আঁখি মেলেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (দ.) কেমন আছেন?’
গোত্রের সব লোক নাখোশ হয়ে চলে গেল যে, আমরা তো তাঁর চিন্তায় অস্থির, আর সে অন্য কারো চিন্তায় নিমগ্ন রয়েছে! তাঁর মমতাময়ী আম্মা বারংবার তাঁকে কিছুনা কিছু পানাহার করতে সাধাসাধি করছিলেন, আর ওই নবী প্রেমিকের একটিই উত্তর ছিল যে, ‘যতক্ষণ প্রেমাস্পদ রাসূল (দ.) কেমন আছেন? জানতে পারবোনা; ততক্ষণ না কিছু খাব, না পান করব’। কলিজার ঠুকরো ছেলের আকুলতা দেখে মা বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! তোমার মাহবূব সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা যে, তিনি কেমন আছেন?’ 
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাদ্বি.) বললেন, হযরত উম্মে জমীল বিনতে খাত্তাবের নিকট গিয়ে হুযূর (দ.)’র বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে আসুন। তাঁর সম্মানিত জননী উম্মে জমীলের নিকট গিয়ে আবূ বকর (রাদ্বি.)’র অবস্থাদি বললেন। যেহেতু তাঁর ওপর তখনও নিজের ইসলাম গ্রহণের বিষয় গোপন রাখার নির্দেশ ছিল, সেহেতু তিনি বললেন, ‘আমি আবূ বকর (রাদ্বি.) ও তাঁর প্রেমাস্পদ মুহাম্মদ (দ.) কে জানিনা-চিনিনা, তবে তুমি চাইলে আমি অবশ্যই তোমার সাথে তোমার ছেলের কাছে যেতে পারি। অতএব হযরত উম্মে জমীল (রা.) তাঁর জননীর সাথে যখন সৈয়্যদুনা আবূ বকর সিদ্দীক (রাদ্বি.)’র নিকট আসলেন, তাঁর অবস্থা অবলোকনে নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে বলতে লাগলেন, ‘আমি আশা করি যে, আল্লাহ অবশ্যই তাদের থেকে আপনার বদলা নেবে’।
তিনি (রাদ্বি.) বললেন যে, ‘ওইসব রাখ, রাসূলুল্লাহ (দ.) কেমন আছেন? তা-ই বল’। উম্মে জমীল (রাদ্বি.) ইঙ্গিত করলেন যে, আপনার জননী রয়েছে। সিদ্দীক (রাদ্বি.) বললেন, ‘চিন্তা করোনা, শীঘ্র বল’। প্রত্যুত্তরে তিনি (রাদ্বি.) বল্লেন, ‘নিরাপদ ও ভালই আছেন’। আবার জানতে চাইলেন, ‘এখন কোথায়?’ উত্তরে বল্লেন, ‘দারে আরক্বমেই আছেন’। এতদশ্রবণে তিনি (রাদ্বি.) বল্লেন, ‘আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার শপথ! যতক্ষণনা আমি এ চোখে আপন মাহবূব (দ.) কে বহাল তবিয়তে না দেখি, ততক্ষণ না আমি কোন খাবার খাব, না কোন পানীয় পান করব’।
রূপ-সম্‘আ মুস্তফা (দ.)’র ওই পতঙ্গে ধরাধরি করে দারে আরক্বমে নেওয়া হলে, হুযূর (দ.) ওই পাগলপারা প্রেমিককে নিজের দিকে আসতে দেখে, আগ বাড়িয়ে ধরলেন এবং ঝুঁকে চুমু দিলেন। সকল মুসলমানও তাঁর প্রতি ঝুঁকে পড়লেন। তিনি (রাদ্বি.) কে আহত দেখে রাসূলুল্লাহ (দ.) বড়ই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন।
তিনি (রাদ্বি.) আরয করলেন যে, আমার আম্মাজান খেদমতে উপস্থিত, তাঁর জন্য দু‘আ করুন; আল্লাহ যেন তাঁকে ঈমানের দৌলতে ধন্য করেন। তিনি (দ.) দু‘আ করলেন আর তাঁর আম্মা ওখানেই ঈমান রত্মে মর্যাদান্বিত হলেন। (তারীখুল খামীস ১ম খণ্ড ২৯৪ পৃষ্ঠা)।