০১:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

‘ইবাদুল্লাহ্ বনাম ‘ইবাদুল কা’বাহ্

  • মুক্তিধারা
  • Update Time : ০৭:১৪:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ অগাস্ট ২০২৫
  • ২২০ Time View

মা’রিফতের নামে কা’বা পূজার ইতিবৃত

✍️ আল্লামা বোরহান উদ্দিন মুহাম্মদ শফিউল বশর 

কেউ তনোমনে কা’বাহ্ পূজারী হলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। আপন প্রবৃত্তিকে উপাস্য রূপে গ্রহণকারী চীয্ও এই সংসারে ঢের রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

“আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জানার ভিত্তিতেই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর রেখেছেন পর্দা; অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না? (সূরা জাসিয়া ২৩ নাম্বার আয়াত)।

কিন্তু আমাদের প্রিয় রাসূল সর্বসৃষ্টির মূল মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামারও পূজ্য সাব্যস্ত করা হবে; উম্মত হিসেবে তা আমরা মেনে নিতে পারিনা। এই মর্মপীড়া ও বিবেকের দংশন হেতু মাবদা ওয়া মা‘আদ কিতাবের একটি পৃষ্ঠার ছবি আমার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করে বিজ্ঞ মুজাদ্দিদীদের নিকট ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলাম। পোস্ট করার অনেক দিন পর জনৈক মুজাদ্দিদী ব্যাখ্যার নামে যে অপব্যাখ্যায়, বিতর্কের নামে যে বিতাণ্ডায় অবতীর্ণ হলেন, তাতে আমার বিস্ময়ের অবধি রইলনা। আব্দুল কা’বাহ্’র ঐহেন বিতাণ্ডার প্রেক্ষিতে বিষয়টির খোলাসা হওয়া জরুরি বিবেচিত হওয়ায় এ নিবন্ধের অবতারণা।

“মুহাম্মদ সির্রে ওয়াহদত হ্যায় কুঈ রায উনকা কিয়া সমঝে?”- মক্ববূল।

ইসলামের প্রায় ১৫ শত বছরের ইতিহাসে মুসলিমদের আক্বীদাহ-বিশ্বাস হল: মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামা বা’দে আয্ খোদা বুযুর্গ। ইসলামের প্রথম হাজার বছরের ইতিহাসে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার সত্তার সাথে কা’বাকে তুলনা করারও কোন নজির নেই; উত্তম বলাতো দূরে থাক।

মোল্লা আলী ক্বারী লিখেছেন,

أجمعوا على أنّ أفضل البلاد مكّة والمدينة زادهما الله شرفًا وتعظيمًا ، ثم اختلفوا بينهما أي في الفضل بينهما ، فقيل : مكة أفضل من المدينة ، وهو مذهب الأئمة الثلاثة وهو المرويُّ عن بعض الصحابة ، وقيل : المدينة أفضل من مكة ، وهو قول بعض المالكية ومن تبعهم من الشافعية ، وقيل بالتسوية بينهما۔۔۔

 والخلاف أي الاختلاف المذكور محصورٌ فيما عدا موضع القبر المقدس ، قال الجمهور : فما ضمّ أعضاءه الشريفة فهو أفضل بقاع الأرض بالإجماع حتى من الكعبة ومن العرش

অর্থাৎ, “বিশ্বমুসলিম একমত যে, উত্তম শহর হল, মক্কা ও মদীনা ( আল্লাহ উভয়ের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করুন)। অতঃপর এই দুইটির মধ্যে কোনটি উত্তম সেই বিষয়ে তাঁরা মতানৈক্য করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, মক্কা মদীনা অপেক্ষা উত্তম; এটি তিন ইমাম ও কতেক সাহাবী থেকেও বর্ণিত। কেউ কেউ বলেছেন, মদীনা মক্কা অপেক্ষা উত্তম; এটি কতেক মালিকী এবং শাফিঈদের যারা তাঁদের অনুসরণ করেছেন, তাঁদের অভিমত। কেউ কেউ উভয় সমমর্যাদার বলেছেন। ——-অধিকন্তু এই মতানৈক্য ক্ববর শরীফের অংশ ব্যতীত বাকি এলাকা নিয়েই সীমিত। অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম বলেছেন, তাঁর (রাসূলে পাকের) পবিত্র শরীর মুবারকের সাথে যা লেগেছে তা সকলের ঐকমত্যে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ স্থান; এমনকি কা’বা ও আর্শ থেকেও।” (আল্মাস্লাকুল মুতাক্বাস্সিত্ব ফীল মান্সাকিল মুতাওয়াস্সিত্ব, ৩৫১- ৩৫২ পৃষ্ঠা) 

 নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার সাথে খানায়ে কা’বার কিবা তুলনা?

উলামায়ে কিরামের দৃষ্টিতে আমার রাসূলের পবিত্র শরীর মুবারকের সাথে মিলিত মাটিও খানায়ে কা’বাতো নয়, আর্শে ‘আযীম অপেক্ষাও উত্তম।

[مكة أفضل من المدينة على الراجح إلا ما ضم أعضاءه عليه الصلاة والسلام؛ فإنه أفضل مطلقًا حتى من الكعبة والعرش والكرسي] اهـ.

“প্রাধান্যশীল উক্তি মতে মদীনা অপেক্ষা মক্কা উত্তম ( এর মানে মদীনাহ্ উত্তম এ কথার পক্ষেও উলামায়ে কিরামের উক্তি রয়েছে); কিন্তু তিনি আলাইহিস্সালামের শরীর মুবারকের সাথে লাগোয়া স্থান শর্তহীন ভাবে উত্তম; এমনকি কা’বাহ্, আর্শ ও কুর্সী থেকেও। [সূত্র: আদ্দুর্রুল মুখতার, দ্বিতীয় খণ্ড, ২৫৭ পৃষ্ঠা, আল্লামাতুল হাসকফী, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ]। 

আফসোস, সহস্র আফসোস! বিশ্বমুসলিমের হাজার বছরের ঐকমত্যের বিপরীত হিজরী একাদশ শতকে কা’বাকে নবীর চেয়ে উত্তম শুধু নয়, বরং নবী ও সকল সৃষ্টির মাসজূদ বা সিজদাকৃত তথা উপাস্য সাব্যস্তের শির্কী আক্বীদার উদ্ভব ঘটল উপমহাদেশে! আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিম্নে উদ্ধৃত অংশ ভালো করে পড়ুন।

حقیقتِ کعبۂ ربانی مسجود حقیقت محمدی گشت؛ مع ذالک حقیقت کعبۂ ربانی فوق حقیقت قرآنی است، آنجا ہمہ بے صفتی و بے رنگی ست، وشیون و اعتبارات را درآں موطن گنجائش نیست، تنزیہ و تقدس را در آنحضرت مجال نہ – ع 

آنجا ہمہ آنست کہ برتر ز بیان ست –

ایں معرفتے است کہ ہیچ یکے از اہل اللہ بآں لب نہ کشادہ است، وبرمز و اشارات ہم ازاں مقولہ سخن نراندہ – ایں درویش را بایں معرفت عظمیٰ مشرف ساختہ اند و درمیان ابناے جنس ممتاز  

گردانیدہ، کل ذالک بصدقۃ حبیب اللہ وبرکۃ رسول اللہ علیہ وعلی آلہ من الصلوات افضلہا ومن التسلیمات اکملہا –

باید دانست کہ صورت کعبہ ہمچناں کہ مسجود صور اشیاست، حقیقت کعبہ نیز مسجود حقائق آں اشیاست- واقول قولا عجبا لم يسمعه احد وما اخبر به مخبر باعلام الله سبحانه و الهامه تعالىٰ ايٓاي يفضله كرمه، آنکہ بعد از ہزار و چند سال از زمان رحلت آں سرور عليه و على اله الصلوات والتحيات زمانے میں آید کہ حقیقت محمدی از مقام خود عروج فرماید وبمقام حقیقت کعبہ متحد گردد- ایں زماں حقیقت محمدی حقیقت احمدی نام یابد و مظہر ذات احد جل سلطانہ گردد، وہردو اسم بمسمی متحقق شود، ومقام سابق از حقیقت محمدی خالی ماند تا زمانے کہ حضرت عیسیٰ علىٰ نبينا و عليه الصلاة والسلام تزول فرمايد، وعمل بشريعت محمدى نمايند عليهما الصلوات والتسليمات و التحيات، دراں وقت حقیقت عیسوی از مقام خود عروج فرمودہ بمقام حقیقت محمدی کہ خالی ماندہ بود استقرار کند-  

“হাক্বীক্বতে কা’বায়ে রব্বানী হাক্বীক্বতে মুহাম্মদীর সিজদাকৃত হয়েছে , সেই সাথে হাক্বীক্বতে কা’বাহ্ হাক্বীক্বতে ক্বুরআনীর ঊর্ধ্বে; সেখানে সম্পূর্ণ বে-সিফতী ও বে-রংগী বা নির্গুণ ও নিরূপ তথা নিরাকার, সেথা আকৃতি-প্রকৃতি ও বিচার-বিবেচনাবলীর অবকাশ নেই, ওই দরবারে পরিশুদ্ধ-পবিত্রকরণের কোন সাধ্য নেই। কবিতায়: ওইখানে সকল কিছু এমন যে, বর্ণনার ঊর্ধ্বে! এটা এমন মা’রিফত বা পরিচয় জ্ঞান যে, কোন আহলুল্লাহ ওই বিষয়ে মুখ খুললেননি; ওই উক্তির প্রতি ইশারা ইঙ্গিতেও কিছু বলেননি। এই দরবেশকে এই মহান পরিচয় জ্ঞানে ধন্য করে স্বজাতি তথা আহলুল্লাহদের মাঝে শ্রেষ্ঠ স্বতন্ত্র করা হয়েছে। ওই সবকিছু হাবীবুল্লাহ রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়া আলিহি আফদ্বালুস সালাওয়াত ওয়া আকমালুত তাসলীমাতের সদক্বাহ ও বরকতে আমার নসীব হয়েছে।

জানা জরুরী যে, সূরতে কা’বাহ্ বা কা’বার আকৃতি যেমন বস্তুসমূহের আকৃতির মসজূদ বা সিজদাকৃত; তেমনি হাক্বীক্বতে কা’বাও (কা’বার মূলও) ঐ সমস্ত বস্তুর হাক্বীক্বত (মূল) কর্তৃক সাজদাহ্ কৃত হয়। পরন্তু আমি একটি এমন আজব কথা বলছি, যা ইতঃপূর্বে কেউ শুনেনি এবং কেউ বলেনি; এটি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার একান্ত অনুগ্রহে কেবলমাত্র আমাকে প্রদত্ত ই’লাম ও ইলহাম এই যে— ওই সরওয়ারে কায়িনাত ﷺ’র ইন্তিকালের এক হাজার বছরাধিক পরে হাক্বীক্বতে মুহাম্মদী নিজ মক্বাম বা স্তর থেকে উচ্চ স্তরে উন্নতি করতঃ হাক্বীক্বতে কা’বার স্তরে একত্রিত হবে। তখন হাক্বীক্বতে মুহাম্মদীর নাম হবে ‘হাক্বীক্বতে আহমদী’ এবং তা একক-অদ্বিতীয় সত্তা (আল্লাহ্‌) জাল্লা সুলত্বানুহুর প্রকাশস্থল হবে। এবং উভয় নাম মুবারক ওই নামকরণকৃতের সত্তায় স্থিত হবে। আর পূর্ববর্তী মক্বাম হাক্বীক্বতে মুহাম্মদী খালিই থাকবে, যাবৎ না ঈসা আলাইহিস্ সালাম অবতরণ করতঃ শরী’য়তে মুহাম্মদী (ﷺ) মোতাবেক আমল করবেন। ওই সময়ে হাক্বীক্বতে ‘ঈসাবী নিজ মক্বাম থেকে উন্নতি করে খালি পড়ে থাকা হাক্বীক্বতে মুহাম্মদীর মক্বামেই অবস্থান করবে।”(মাবদা ওয়া মা‘আদ ৭২-৭৩ পৃষ্ঠা)।

উদ্ধৃত অংশের পূর্বাপর আমলে নিয়ে কারো কিছু বলার থাকলে বলতে পারবেন। আশা করি, ঐ কথার সমর্থনে কুরআন- সুন্নাহয় দলীল খুঁজার বোকামি কেউ করবেননা; যেহেতু স্বয়ং প্রবক্তাই বলে দিয়েছেন, وما اخبر به مخبر অর্থাৎ “কোন সংবাদদাতা এই সংবাদ দেননি” এমনকি মুখবিরে সাদিক্ব আলাইহিস্সালামও না! لم يسمعه احد “কেউ এই কথা শুনেনি” এমনকি সাহাবায়ে কিরামও না! ইসলামের প্রথম সহস্রাব্দের ইলমে কালাম, ইলমে তাসাওউফ, ইলমে ফিক্ব্হ ও ইলমে ফালাসাফাহ্’র কিতাবের কোথাও তা থাকবেনা; স্বয়ং প্রবক্তার দাবিতে তা স্পষ্ট। 

উল্লেখ্য, আদ্দুর্রুল মুখতার এর উদ্ধৃতিতে উদ্ধৃত “কা’বা, আর্শ ও কুর্সী অপেক্ষাও উত্তম” উক্তিকে কেউ যদি “শুধু কা’বার মাটি থেকে উত্তম” বলে মাটির সাথে নির্দিষ্ট করতে চায়, তবে তা বড়ই বিনোদনমূলক; তাকে আর্শ ও কুর্সীর জন্যও “তামা-তক্তা” কিছু একটা নির্বাচন করতে হবে!

হাক্বীক্বতে মুহাম্মদী বোধ-বুদ্ধির অগম্য। যা পূর্ণ অনুধাবন করা যায় না, তা পূর্ণরূপে ছেড়েও দেওয়া যায় না মর্মে আল্লামা সায়্যিদ শরীফ জুরজানী লিখেছেন, 

الحقيقة المحمدية: هي الذات مع التعين الاول، وهو الاسم الأعظم-

“আল্হাক্বীকতুল মুহাম্মদিয়্যাহ্ হল, প্রথম নির্ণয় যোগে যাত বা সত্তা; এবং তা হল, আস্মে আ’যম” (আত্তা’রীফাত ১৫৩ পৃষ্ঠা)।

তা‘আয়্য়ুনে আওয়ালের আগে বা ঊর্ধ্বে লা তা‘আয়্য়ুন।

“রহমতুল্লিল আলামীন বনাম হুদাল্লিল আলামীন” এর বেহুদা তর্কে কেউ যদি “বরকতময় ও জগতের নির্দেশনা রূপে মানব জাতির জন্য নির্মিত মক্কায় অবস্থিত প্রথম ঘর”কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার ওপর ফদ্বীলত দেওয়ার চেষ্টা করে, তা চরম বালকত্ব বৈ কিছু নয়। কা’বা যেমন মক্কায় অবস্থিত পাথরের একটি ঘরমাত্র নয়, তেমনি মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামাও মক্কার পবিত্র ভূমিতে খাজা আব্দুল্লাহর ঘরে,মা আমীনাহ’র কোলে আগত, তেপান্ন বছর মক্কায় এবং দশ বছর মদীনায় বসবাসরত একজন সাধারণ মানুষ নন। তাঁর বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর সূরতে বশরী, সূরতে মলকী ও সূরতে হক্বীর কথা মাথায় রেখে বলতে হবে। অন্যথায় “مَالِ هَٰذَا الرَّسُولِ“ উক্তির প্রবক্তাদের পশ্চাদানুসরণে পরকালে কুরাইশ নেতৃবর্গের সাঙ্গলাভ ছাড়া কিছুই অর্জিত হবে না। এমন অবোধ বালকদের জন্য প্রথমে “হুদাল্লিল আলামীন”আয়াতের অবতরণ প্রেক্ষাপট বর্ণনা সমীচিন মনে করি।

قوله تعالى : ( إن أول بيت وضع للناس للذي ببكة مباركا ) سبب [ نزول هذه الآية ] أن اليهود قالوا للمسلمين : بيت المقدس قبلتنا ، وهو أفضل من الكعبة وأقدم ، وهو مهاجر الأنبياء ، وقال المسلمون بل الكعبة أفضل ، فأنزل الله تعالى : ( إن أول بيت وضع للناس للذي ببكة مباركا وهدى للعالمين )

( فيه آيات بينات مقام إبراهيم ومن دخله كان آمنا ) وليس شيء من هذه الفضائل لبيت المقدس .

“আল্লাহর বাণী : (নিশ্চয় মানুষদের জন্য নির্মিত প্রথম ঘর; যা মক্কায় অবস্থিত, বরকতময়) অবতরণ প্রেক্ষাপট: ইয়াহূদগণ মুসলিমদের বলল, বায়তুল মুক্বদেস আমাদের ক্বিবলা; সেটা কা’বা থেকে উত্তম এবং অগ্রগণ্য/প্রাচীন; সেটি আম্বিয়ায়ে কিরামের হিজরতগাহ। মুসলিমরা বললেন, কা’বা উত্তম। অতএব আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন, (নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্মিত হয়েছে, যা মক্কায় অবস্থিত, বরকতময় ও বিশ্বজাহানের জন্য পথনির্দেশনা)। (এতে রয়েছে প্রকৃষ্ট নিদর্শন: মকামে ইব্রাহীম; আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে)। এই ফদ্বীলতসমূহের কোনটিই বায়তুল মুক্বদেসের নেই। (তাফসীরে বাগভী)।

আল্লাহ তা‘আলা দিলেন, বায়তুল মুক্বদেস অপেক্ষা কা’বা উত্তমের দলীল; আর তা প্রয়োগ করা হচ্ছে,নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামা থেকে কা’বাহ্ উত্তমের দলীল রূপে!!! এটা কালামুল্লাহ’র অপব্যাখ্যা নয়তো কি!

কা’বাহ’র প্রেমে পাগলপারা ( পাগল+পারা শব্দের অর্থ: পাগল- বিণ. বি. ১ উম্মাদ, বাতুল,খ্যাপা; ২ মত্ত, প্রমত্ত; ৩ অস্থির ৪ ( আদরে) অবোধ। পারা- অব্য. বিণ. সদৃশ, মতো, তুল্য। সংসদ বাংলা অভিধান) হয়ে যারা “রহমতুল্লিল আলামীন বনাম হুদাল্লিল আলামীন” এর বেহুদা তর্কে উম্মাদ, তাদের বুঝার সুবিধার্থে নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে “হুদাল্লিল আলামীন” এর মর্ম উপস্থাপিত হল,

الصفة الثالثة : من صفات هذا البيت كونه { هدى للعالمين } وفيه مسألتان :

المسألة الأولى : قيل : المعنى أنه قبلة للعالمين يهتدون به إلى جهة صلاتهم ، وقيل : هدى للعالمين أي دلالة على وجود الصانع المختار ، وصدق محمد صلى الله عليه وسلم في النبوة بما فيه من الآيات التي ذكرناها والعجائب التي حكيناها فإن كل ما يدل على النبوة فهو بعينه يدل أولا على وجود الصانع ، وجميع صفاته من العلم والقدرة والحكمة والاستغناء ، وقيل : هدى للعالمين إلى الجنة لأن من أدى الصلوات الواجبة إليها استوجب الجنة . 

المسألة الثانية : قال الزجاج : المعنى وذا هدى للعالمين 

অর্থাৎ, “ তৃতীয় গুণ: এই ঘরের গুণাবলীর মধ্যে তৃতীয় গুণ হল, সেটার {বিশ্বজগতের হিদায়ত} হওয়া; এবং এতে রয়েছে দু’টি মাসআলাহ্:

প্রথম মাসআলাহ্: বলা হয়েছে যে, এর অর্থ তা জগতের ক্বিবলাহ্; যদ্ধারা তারা তাদের নামাযের দিকনির্দেশনা পায়। এবং বলা হয়েছে, হুদাল্লিল আলামীন অর্থাৎ তাতে স্থিত নিদর্শনাবলী ও আশ্চর্যাবলী যা আমরা উল্লেখ ও বর্ণনা করেছি, তদ্ধারা সার্বভৌম ইচ্ছাময় স্রষ্টার অস্তিত্ব এবং নবূয়তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার সত্যতা নির্দেশ করে। কেননা যা নবূয়তের সত্যতা বুঝায়, তা তার সত্তা যোগে প্রথমে স্রষ্টার অস্তিত্ব ও সমুদয় গুণাবলী যেমন- ইলম বা জ্ঞান, ক্বুদরত বা শক্তি, হিকমত বা প্রজ্ঞা ও ইস্তিগনা বা অমুখাপেক্ষিতাও নির্দেশ করে। এবং বলা হয়েছে যে, জগতের জন্য জান্নাতের পথ নির্দেশক; কেননা, যে ব্যক্তি সেটার দিকে হয়ে ফরয নামায আদায় করে, তার জন্য জান্নাত আবশ্যক হয়।

দ্বিতীয় মাসআলাহ্: যুজাজ বলেন, এর অর্থ হলো জগতের জন্য নির্দেশনা সম্পন্ন।” (মাফাতীহুল গায়ব, ফখরুদ্দীন রাযী)।

{ وهدى للعالمين } والهدى نوعان: هدى في المعرفة، وهدى في العمل، فالهدى في العمل ظاهر، وهو ما جعل الله فيه من أنواع التعبدات المختصة به، وأما هدى العلم فبما يحصل لهم بسببه من العلم بالحق بسبب الآيات البينات التي ذكر الله تعالى في قوله { فيه آيات بينات }

{ এবং সমগ্র জগতের জন্য হিদায়ত} হিদায়ত দুই প্রকার: জ্ঞানে হিদায়ত ও কর্মে হিদায়ত; ফের কর্মে হিদায়ত স্পষ্ট, তা হলো, আল্লাহ তা‘আলা তার সাথে নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত রেখেছেন। অতঃপর জ্ঞানে হিদায়ত হলো, তার কারণে হক্বের যে জ্ঞান তাদের অর্জন হয়, সুস্পষ্ট নিদর্শনের কারণে যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণী { তাতে রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী}তে উল্লেখ করেছেন। (তাফসীরে সা‘আদী, আব্দুর রহমান বিন নাসিরুদ্দীন আস্সা‘আদী)।

মুফাস্সিরীনে কিরামের উক্ত ব্যাখ্যার আলোকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কা’বা বিশেষিত হিদায়ত। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, কা’বা হল: মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার নবূয়তের সত্যতার অন্যতম প্রকৃষ্ট নিদর্শনই মাত্র। কা’বা সার্বিক হিদায়ত হলে, আল্লাহ তা‘আলা হিদায়ত ও দীনে হক্বসহ তাঁর রাসূলকে প্রেরণের প্রয়োজন পড়তোনা। ইরশাদ হচ্ছে, هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ “তিনি সেই সত্তা, যিনি তাঁর রসূলকে হিদায়ত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন” (সূরা ফাতাহ, ২৮ নাম্বার আয়াত সংক্ষেপিত)।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

‘ইবাদুল্লাহ্ বনাম ‘ইবাদুল কা’বাহ্

Update Time : ০৭:১৪:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ অগাস্ট ২০২৫

মা’রিফতের নামে কা’বা পূজার ইতিবৃত

✍️ আল্লামা বোরহান উদ্দিন মুহাম্মদ শফিউল বশর 

কেউ তনোমনে কা’বাহ্ পূজারী হলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। আপন প্রবৃত্তিকে উপাস্য রূপে গ্রহণকারী চীয্ও এই সংসারে ঢের রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

“আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জানার ভিত্তিতেই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর রেখেছেন পর্দা; অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না? (সূরা জাসিয়া ২৩ নাম্বার আয়াত)।

কিন্তু আমাদের প্রিয় রাসূল সর্বসৃষ্টির মূল মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামারও পূজ্য সাব্যস্ত করা হবে; উম্মত হিসেবে তা আমরা মেনে নিতে পারিনা। এই মর্মপীড়া ও বিবেকের দংশন হেতু মাবদা ওয়া মা‘আদ কিতাবের একটি পৃষ্ঠার ছবি আমার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করে বিজ্ঞ মুজাদ্দিদীদের নিকট ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলাম। পোস্ট করার অনেক দিন পর জনৈক মুজাদ্দিদী ব্যাখ্যার নামে যে অপব্যাখ্যায়, বিতর্কের নামে যে বিতাণ্ডায় অবতীর্ণ হলেন, তাতে আমার বিস্ময়ের অবধি রইলনা। আব্দুল কা’বাহ্’র ঐহেন বিতাণ্ডার প্রেক্ষিতে বিষয়টির খোলাসা হওয়া জরুরি বিবেচিত হওয়ায় এ নিবন্ধের অবতারণা।

“মুহাম্মদ সির্রে ওয়াহদত হ্যায় কুঈ রায উনকা কিয়া সমঝে?”- মক্ববূল।

ইসলামের প্রায় ১৫ শত বছরের ইতিহাসে মুসলিমদের আক্বীদাহ-বিশ্বাস হল: মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামা বা’দে আয্ খোদা বুযুর্গ। ইসলামের প্রথম হাজার বছরের ইতিহাসে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার সত্তার সাথে কা’বাকে তুলনা করারও কোন নজির নেই; উত্তম বলাতো দূরে থাক।

মোল্লা আলী ক্বারী লিখেছেন,

أجمعوا على أنّ أفضل البلاد مكّة والمدينة زادهما الله شرفًا وتعظيمًا ، ثم اختلفوا بينهما أي في الفضل بينهما ، فقيل : مكة أفضل من المدينة ، وهو مذهب الأئمة الثلاثة وهو المرويُّ عن بعض الصحابة ، وقيل : المدينة أفضل من مكة ، وهو قول بعض المالكية ومن تبعهم من الشافعية ، وقيل بالتسوية بينهما۔۔۔

 والخلاف أي الاختلاف المذكور محصورٌ فيما عدا موضع القبر المقدس ، قال الجمهور : فما ضمّ أعضاءه الشريفة فهو أفضل بقاع الأرض بالإجماع حتى من الكعبة ومن العرش

অর্থাৎ, “বিশ্বমুসলিম একমত যে, উত্তম শহর হল, মক্কা ও মদীনা ( আল্লাহ উভয়ের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করুন)। অতঃপর এই দুইটির মধ্যে কোনটি উত্তম সেই বিষয়ে তাঁরা মতানৈক্য করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, মক্কা মদীনা অপেক্ষা উত্তম; এটি তিন ইমাম ও কতেক সাহাবী থেকেও বর্ণিত। কেউ কেউ বলেছেন, মদীনা মক্কা অপেক্ষা উত্তম; এটি কতেক মালিকী এবং শাফিঈদের যারা তাঁদের অনুসরণ করেছেন, তাঁদের অভিমত। কেউ কেউ উভয় সমমর্যাদার বলেছেন। ——-অধিকন্তু এই মতানৈক্য ক্ববর শরীফের অংশ ব্যতীত বাকি এলাকা নিয়েই সীমিত। অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম বলেছেন, তাঁর (রাসূলে পাকের) পবিত্র শরীর মুবারকের সাথে যা লেগেছে তা সকলের ঐকমত্যে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ স্থান; এমনকি কা’বা ও আর্শ থেকেও।” (আল্মাস্লাকুল মুতাক্বাস্সিত্ব ফীল মান্সাকিল মুতাওয়াস্সিত্ব, ৩৫১- ৩৫২ পৃষ্ঠা) 

 নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার সাথে খানায়ে কা’বার কিবা তুলনা?

উলামায়ে কিরামের দৃষ্টিতে আমার রাসূলের পবিত্র শরীর মুবারকের সাথে মিলিত মাটিও খানায়ে কা’বাতো নয়, আর্শে ‘আযীম অপেক্ষাও উত্তম।

[مكة أفضل من المدينة على الراجح إلا ما ضم أعضاءه عليه الصلاة والسلام؛ فإنه أفضل مطلقًا حتى من الكعبة والعرش والكرسي] اهـ.

“প্রাধান্যশীল উক্তি মতে মদীনা অপেক্ষা মক্কা উত্তম ( এর মানে মদীনাহ্ উত্তম এ কথার পক্ষেও উলামায়ে কিরামের উক্তি রয়েছে); কিন্তু তিনি আলাইহিস্সালামের শরীর মুবারকের সাথে লাগোয়া স্থান শর্তহীন ভাবে উত্তম; এমনকি কা’বাহ্, আর্শ ও কুর্সী থেকেও। [সূত্র: আদ্দুর্রুল মুখতার, দ্বিতীয় খণ্ড, ২৫৭ পৃষ্ঠা, আল্লামাতুল হাসকফী, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ]। 

আফসোস, সহস্র আফসোস! বিশ্বমুসলিমের হাজার বছরের ঐকমত্যের বিপরীত হিজরী একাদশ শতকে কা’বাকে নবীর চেয়ে উত্তম শুধু নয়, বরং নবী ও সকল সৃষ্টির মাসজূদ বা সিজদাকৃত তথা উপাস্য সাব্যস্তের শির্কী আক্বীদার উদ্ভব ঘটল উপমহাদেশে! আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিম্নে উদ্ধৃত অংশ ভালো করে পড়ুন।

حقیقتِ کعبۂ ربانی مسجود حقیقت محمدی گشت؛ مع ذالک حقیقت کعبۂ ربانی فوق حقیقت قرآنی است، آنجا ہمہ بے صفتی و بے رنگی ست، وشیون و اعتبارات را درآں موطن گنجائش نیست، تنزیہ و تقدس را در آنحضرت مجال نہ – ع 

آنجا ہمہ آنست کہ برتر ز بیان ست –

ایں معرفتے است کہ ہیچ یکے از اہل اللہ بآں لب نہ کشادہ است، وبرمز و اشارات ہم ازاں مقولہ سخن نراندہ – ایں درویش را بایں معرفت عظمیٰ مشرف ساختہ اند و درمیان ابناے جنس ممتاز  

گردانیدہ، کل ذالک بصدقۃ حبیب اللہ وبرکۃ رسول اللہ علیہ وعلی آلہ من الصلوات افضلہا ومن التسلیمات اکملہا –

باید دانست کہ صورت کعبہ ہمچناں کہ مسجود صور اشیاست، حقیقت کعبہ نیز مسجود حقائق آں اشیاست- واقول قولا عجبا لم يسمعه احد وما اخبر به مخبر باعلام الله سبحانه و الهامه تعالىٰ ايٓاي يفضله كرمه، آنکہ بعد از ہزار و چند سال از زمان رحلت آں سرور عليه و على اله الصلوات والتحيات زمانے میں آید کہ حقیقت محمدی از مقام خود عروج فرماید وبمقام حقیقت کعبہ متحد گردد- ایں زماں حقیقت محمدی حقیقت احمدی نام یابد و مظہر ذات احد جل سلطانہ گردد، وہردو اسم بمسمی متحقق شود، ومقام سابق از حقیقت محمدی خالی ماند تا زمانے کہ حضرت عیسیٰ علىٰ نبينا و عليه الصلاة والسلام تزول فرمايد، وعمل بشريعت محمدى نمايند عليهما الصلوات والتسليمات و التحيات، دراں وقت حقیقت عیسوی از مقام خود عروج فرمودہ بمقام حقیقت محمدی کہ خالی ماندہ بود استقرار کند-  

“হাক্বীক্বতে কা’বায়ে রব্বানী হাক্বীক্বতে মুহাম্মদীর সিজদাকৃত হয়েছে , সেই সাথে হাক্বীক্বতে কা’বাহ্ হাক্বীক্বতে ক্বুরআনীর ঊর্ধ্বে; সেখানে সম্পূর্ণ বে-সিফতী ও বে-রংগী বা নির্গুণ ও নিরূপ তথা নিরাকার, সেথা আকৃতি-প্রকৃতি ও বিচার-বিবেচনাবলীর অবকাশ নেই, ওই দরবারে পরিশুদ্ধ-পবিত্রকরণের কোন সাধ্য নেই। কবিতায়: ওইখানে সকল কিছু এমন যে, বর্ণনার ঊর্ধ্বে! এটা এমন মা’রিফত বা পরিচয় জ্ঞান যে, কোন আহলুল্লাহ ওই বিষয়ে মুখ খুললেননি; ওই উক্তির প্রতি ইশারা ইঙ্গিতেও কিছু বলেননি। এই দরবেশকে এই মহান পরিচয় জ্ঞানে ধন্য করে স্বজাতি তথা আহলুল্লাহদের মাঝে শ্রেষ্ঠ স্বতন্ত্র করা হয়েছে। ওই সবকিছু হাবীবুল্লাহ রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়া আলিহি আফদ্বালুস সালাওয়াত ওয়া আকমালুত তাসলীমাতের সদক্বাহ ও বরকতে আমার নসীব হয়েছে।

জানা জরুরী যে, সূরতে কা’বাহ্ বা কা’বার আকৃতি যেমন বস্তুসমূহের আকৃতির মসজূদ বা সিজদাকৃত; তেমনি হাক্বীক্বতে কা’বাও (কা’বার মূলও) ঐ সমস্ত বস্তুর হাক্বীক্বত (মূল) কর্তৃক সাজদাহ্ কৃত হয়। পরন্তু আমি একটি এমন আজব কথা বলছি, যা ইতঃপূর্বে কেউ শুনেনি এবং কেউ বলেনি; এটি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার একান্ত অনুগ্রহে কেবলমাত্র আমাকে প্রদত্ত ই’লাম ও ইলহাম এই যে— ওই সরওয়ারে কায়িনাত ﷺ’র ইন্তিকালের এক হাজার বছরাধিক পরে হাক্বীক্বতে মুহাম্মদী নিজ মক্বাম বা স্তর থেকে উচ্চ স্তরে উন্নতি করতঃ হাক্বীক্বতে কা’বার স্তরে একত্রিত হবে। তখন হাক্বীক্বতে মুহাম্মদীর নাম হবে ‘হাক্বীক্বতে আহমদী’ এবং তা একক-অদ্বিতীয় সত্তা (আল্লাহ্‌) জাল্লা সুলত্বানুহুর প্রকাশস্থল হবে। এবং উভয় নাম মুবারক ওই নামকরণকৃতের সত্তায় স্থিত হবে। আর পূর্ববর্তী মক্বাম হাক্বীক্বতে মুহাম্মদী খালিই থাকবে, যাবৎ না ঈসা আলাইহিস্ সালাম অবতরণ করতঃ শরী’য়তে মুহাম্মদী (ﷺ) মোতাবেক আমল করবেন। ওই সময়ে হাক্বীক্বতে ‘ঈসাবী নিজ মক্বাম থেকে উন্নতি করে খালি পড়ে থাকা হাক্বীক্বতে মুহাম্মদীর মক্বামেই অবস্থান করবে।”(মাবদা ওয়া মা‘আদ ৭২-৭৩ পৃষ্ঠা)।

উদ্ধৃত অংশের পূর্বাপর আমলে নিয়ে কারো কিছু বলার থাকলে বলতে পারবেন। আশা করি, ঐ কথার সমর্থনে কুরআন- সুন্নাহয় দলীল খুঁজার বোকামি কেউ করবেননা; যেহেতু স্বয়ং প্রবক্তাই বলে দিয়েছেন, وما اخبر به مخبر অর্থাৎ “কোন সংবাদদাতা এই সংবাদ দেননি” এমনকি মুখবিরে সাদিক্ব আলাইহিস্সালামও না! لم يسمعه احد “কেউ এই কথা শুনেনি” এমনকি সাহাবায়ে কিরামও না! ইসলামের প্রথম সহস্রাব্দের ইলমে কালাম, ইলমে তাসাওউফ, ইলমে ফিক্ব্হ ও ইলমে ফালাসাফাহ্’র কিতাবের কোথাও তা থাকবেনা; স্বয়ং প্রবক্তার দাবিতে তা স্পষ্ট। 

উল্লেখ্য, আদ্দুর্রুল মুখতার এর উদ্ধৃতিতে উদ্ধৃত “কা’বা, আর্শ ও কুর্সী অপেক্ষাও উত্তম” উক্তিকে কেউ যদি “শুধু কা’বার মাটি থেকে উত্তম” বলে মাটির সাথে নির্দিষ্ট করতে চায়, তবে তা বড়ই বিনোদনমূলক; তাকে আর্শ ও কুর্সীর জন্যও “তামা-তক্তা” কিছু একটা নির্বাচন করতে হবে!

হাক্বীক্বতে মুহাম্মদী বোধ-বুদ্ধির অগম্য। যা পূর্ণ অনুধাবন করা যায় না, তা পূর্ণরূপে ছেড়েও দেওয়া যায় না মর্মে আল্লামা সায়্যিদ শরীফ জুরজানী লিখেছেন, 

الحقيقة المحمدية: هي الذات مع التعين الاول، وهو الاسم الأعظم-

“আল্হাক্বীকতুল মুহাম্মদিয়্যাহ্ হল, প্রথম নির্ণয় যোগে যাত বা সত্তা; এবং তা হল, আস্মে আ’যম” (আত্তা’রীফাত ১৫৩ পৃষ্ঠা)।

তা‘আয়্য়ুনে আওয়ালের আগে বা ঊর্ধ্বে লা তা‘আয়্য়ুন।

“রহমতুল্লিল আলামীন বনাম হুদাল্লিল আলামীন” এর বেহুদা তর্কে কেউ যদি “বরকতময় ও জগতের নির্দেশনা রূপে মানব জাতির জন্য নির্মিত মক্কায় অবস্থিত প্রথম ঘর”কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার ওপর ফদ্বীলত দেওয়ার চেষ্টা করে, তা চরম বালকত্ব বৈ কিছু নয়। কা’বা যেমন মক্কায় অবস্থিত পাথরের একটি ঘরমাত্র নয়, তেমনি মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামাও মক্কার পবিত্র ভূমিতে খাজা আব্দুল্লাহর ঘরে,মা আমীনাহ’র কোলে আগত, তেপান্ন বছর মক্কায় এবং দশ বছর মদীনায় বসবাসরত একজন সাধারণ মানুষ নন। তাঁর বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর সূরতে বশরী, সূরতে মলকী ও সূরতে হক্বীর কথা মাথায় রেখে বলতে হবে। অন্যথায় “مَالِ هَٰذَا الرَّسُولِ“ উক্তির প্রবক্তাদের পশ্চাদানুসরণে পরকালে কুরাইশ নেতৃবর্গের সাঙ্গলাভ ছাড়া কিছুই অর্জিত হবে না। এমন অবোধ বালকদের জন্য প্রথমে “হুদাল্লিল আলামীন”আয়াতের অবতরণ প্রেক্ষাপট বর্ণনা সমীচিন মনে করি।

قوله تعالى : ( إن أول بيت وضع للناس للذي ببكة مباركا ) سبب [ نزول هذه الآية ] أن اليهود قالوا للمسلمين : بيت المقدس قبلتنا ، وهو أفضل من الكعبة وأقدم ، وهو مهاجر الأنبياء ، وقال المسلمون بل الكعبة أفضل ، فأنزل الله تعالى : ( إن أول بيت وضع للناس للذي ببكة مباركا وهدى للعالمين )

( فيه آيات بينات مقام إبراهيم ومن دخله كان آمنا ) وليس شيء من هذه الفضائل لبيت المقدس .

“আল্লাহর বাণী : (নিশ্চয় মানুষদের জন্য নির্মিত প্রথম ঘর; যা মক্কায় অবস্থিত, বরকতময়) অবতরণ প্রেক্ষাপট: ইয়াহূদগণ মুসলিমদের বলল, বায়তুল মুক্বদেস আমাদের ক্বিবলা; সেটা কা’বা থেকে উত্তম এবং অগ্রগণ্য/প্রাচীন; সেটি আম্বিয়ায়ে কিরামের হিজরতগাহ। মুসলিমরা বললেন, কা’বা উত্তম। অতএব আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেন, (নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্মিত হয়েছে, যা মক্কায় অবস্থিত, বরকতময় ও বিশ্বজাহানের জন্য পথনির্দেশনা)। (এতে রয়েছে প্রকৃষ্ট নিদর্শন: মকামে ইব্রাহীম; আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে)। এই ফদ্বীলতসমূহের কোনটিই বায়তুল মুক্বদেসের নেই। (তাফসীরে বাগভী)।

আল্লাহ তা‘আলা দিলেন, বায়তুল মুক্বদেস অপেক্ষা কা’বা উত্তমের দলীল; আর তা প্রয়োগ করা হচ্ছে,নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামা থেকে কা’বাহ্ উত্তমের দলীল রূপে!!! এটা কালামুল্লাহ’র অপব্যাখ্যা নয়তো কি!

কা’বাহ’র প্রেমে পাগলপারা ( পাগল+পারা শব্দের অর্থ: পাগল- বিণ. বি. ১ উম্মাদ, বাতুল,খ্যাপা; ২ মত্ত, প্রমত্ত; ৩ অস্থির ৪ ( আদরে) অবোধ। পারা- অব্য. বিণ. সদৃশ, মতো, তুল্য। সংসদ বাংলা অভিধান) হয়ে যারা “রহমতুল্লিল আলামীন বনাম হুদাল্লিল আলামীন” এর বেহুদা তর্কে উম্মাদ, তাদের বুঝার সুবিধার্থে নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে “হুদাল্লিল আলামীন” এর মর্ম উপস্থাপিত হল,

الصفة الثالثة : من صفات هذا البيت كونه { هدى للعالمين } وفيه مسألتان :

المسألة الأولى : قيل : المعنى أنه قبلة للعالمين يهتدون به إلى جهة صلاتهم ، وقيل : هدى للعالمين أي دلالة على وجود الصانع المختار ، وصدق محمد صلى الله عليه وسلم في النبوة بما فيه من الآيات التي ذكرناها والعجائب التي حكيناها فإن كل ما يدل على النبوة فهو بعينه يدل أولا على وجود الصانع ، وجميع صفاته من العلم والقدرة والحكمة والاستغناء ، وقيل : هدى للعالمين إلى الجنة لأن من أدى الصلوات الواجبة إليها استوجب الجنة . 

المسألة الثانية : قال الزجاج : المعنى وذا هدى للعالمين 

অর্থাৎ, “ তৃতীয় গুণ: এই ঘরের গুণাবলীর মধ্যে তৃতীয় গুণ হল, সেটার {বিশ্বজগতের হিদায়ত} হওয়া; এবং এতে রয়েছে দু’টি মাসআলাহ্:

প্রথম মাসআলাহ্: বলা হয়েছে যে, এর অর্থ তা জগতের ক্বিবলাহ্; যদ্ধারা তারা তাদের নামাযের দিকনির্দেশনা পায়। এবং বলা হয়েছে, হুদাল্লিল আলামীন অর্থাৎ তাতে স্থিত নিদর্শনাবলী ও আশ্চর্যাবলী যা আমরা উল্লেখ ও বর্ণনা করেছি, তদ্ধারা সার্বভৌম ইচ্ছাময় স্রষ্টার অস্তিত্ব এবং নবূয়তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার সত্যতা নির্দেশ করে। কেননা যা নবূয়তের সত্যতা বুঝায়, তা তার সত্তা যোগে প্রথমে স্রষ্টার অস্তিত্ব ও সমুদয় গুণাবলী যেমন- ইলম বা জ্ঞান, ক্বুদরত বা শক্তি, হিকমত বা প্রজ্ঞা ও ইস্তিগনা বা অমুখাপেক্ষিতাও নির্দেশ করে। এবং বলা হয়েছে যে, জগতের জন্য জান্নাতের পথ নির্দেশক; কেননা, যে ব্যক্তি সেটার দিকে হয়ে ফরয নামায আদায় করে, তার জন্য জান্নাত আবশ্যক হয়।

দ্বিতীয় মাসআলাহ্: যুজাজ বলেন, এর অর্থ হলো জগতের জন্য নির্দেশনা সম্পন্ন।” (মাফাতীহুল গায়ব, ফখরুদ্দীন রাযী)।

{ وهدى للعالمين } والهدى نوعان: هدى في المعرفة، وهدى في العمل، فالهدى في العمل ظاهر، وهو ما جعل الله فيه من أنواع التعبدات المختصة به، وأما هدى العلم فبما يحصل لهم بسببه من العلم بالحق بسبب الآيات البينات التي ذكر الله تعالى في قوله { فيه آيات بينات }

{ এবং সমগ্র জগতের জন্য হিদায়ত} হিদায়ত দুই প্রকার: জ্ঞানে হিদায়ত ও কর্মে হিদায়ত; ফের কর্মে হিদায়ত স্পষ্ট, তা হলো, আল্লাহ তা‘আলা তার সাথে নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত রেখেছেন। অতঃপর জ্ঞানে হিদায়ত হলো, তার কারণে হক্বের যে জ্ঞান তাদের অর্জন হয়, সুস্পষ্ট নিদর্শনের কারণে যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণী { তাতে রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী}তে উল্লেখ করেছেন। (তাফসীরে সা‘আদী, আব্দুর রহমান বিন নাসিরুদ্দীন আস্সা‘আদী)।

মুফাস্সিরীনে কিরামের উক্ত ব্যাখ্যার আলোকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কা’বা বিশেষিত হিদায়ত। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, কা’বা হল: মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামার নবূয়তের সত্যতার অন্যতম প্রকৃষ্ট নিদর্শনই মাত্র। কা’বা সার্বিক হিদায়ত হলে, আল্লাহ তা‘আলা হিদায়ত ও দীনে হক্বসহ তাঁর রাসূলকে প্রেরণের প্রয়োজন পড়তোনা। ইরশাদ হচ্ছে, هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ “তিনি সেই সত্তা, যিনি তাঁর রসূলকে হিদায়ত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন” (সূরা ফাতাহ, ২৮ নাম্বার আয়াত সংক্ষেপিত)।