১১:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫

প্রেমাস্পদের গলি

  • মুক্তিধারা
  • Update Time : ০৪:৪৭:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ অগাস্ট ২০২৫
  • ৪০৫ Time View

✍️ প্রমিত মুন্তাসির পান্থ 

(আরশাদুল ক্বাদেরী (রহ.)’র লালাঃযার অবলম্বনে)
আব্দুল্লাহ ইরাকের প্রসিদ্ধ ডাকাত: লুট-পাট, ছিনতাই ও অত্যাচার- হত্যা ইত্যাদি তার পেশা। সে আজ এক ভয়ানক অভিযান হতে ফিরে নিজ ঘরে এল। অনেক রাত অতিবাহিত হল। সাঙ্গ-পাঙ্গরা বিদায়ের বেলায় জিজ্ঞাসা করল, সরদার! দ্বিতীয় অভিযানের প্রস্তুতি কখন হবে?
না জানি আজ কে যে, এ প্রশ্নে আব্দুল্লাহর চেহরায় আনন্দের কোন চিহ্ন ফুটে ওঠলনা। সে অত্যন্ত অন্যমনষ্কতায় উত্তর দিল, “এখন কিছু বলা যাচ্ছেনা। প্রস্তুতির সংবাদ সময়ের পূর্বে তোমাদের দেওয়া হবে”।
সঙ্গী-সাথীদের বিদায় দিয়ে সে যখন শয্যাগত হল, তখন এক অজানা যন্ত্রণায় তার অন্তর ভারাক্রান্ত ছিল। সহস্র প্রচেষ্টায় তার ঘুম আসছিলনা। কয়েক মুহূর্ত পর মনে হল কেউ তার অন্তর দ্বারে করাঘাত করছে, সে অবাক হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত বিছানায় ওঠে বসল। অলসতার নিদ্রা অতি গভীর ছিল, তাই মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু এবার অন্তরের বদ্ধদ্বার খানিকটা উম্মুক্ত হয়েছিল এবং অদৃশ্য আহ্বানকারীর কানাঘুষার জন্য একটু ফাঁক সৃষ্টি হল।
হঠাৎ অন্তরের ছিদ্র দিয়ে কেউ চুপিচুপি বলে ওঠল, জালেম! একটু পেছনে তাকিয়ে দেখ। তোমার জীবন লিপির প্রতিটি পৃষ্ঠা কাল হয়ে গিয়েছে। মজলুমদের উফ্ শব্দ, নিস্পাপদের রক্ত এবং পাপের বোঝায় তোমার উদ্ধত ঘাড় মচকিতে বসেছে। মৃত্যুর পর যখন একজন দাম্ভিক অপরাধীর মতো তোমাকে মহাপরাক্রমশীল আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত করা হবে, তখন তাঁর মহানত্বের মহত্বের ভয়ে তোমার কলিজা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। পরিণতির আপমান ও জাহান্নামের ভয়ানক শাস্তি হতে বাঁচতে চাইলে এখনও সময় আছে। ওঠ, নিজের মাটির এ দেহ হতে শয়তানের  জামা খুলে ফেলে দাও। ক্ষমা ও দয়ার দ্বার এখনও খোলা আছে। যে করেই হোক নিজের অসন্তুষ্ট মাওলাকে রাজি করে নাও। অদৃশ্য বাণীর এ অস্ফুট আহ্বান অতি তীক্ষè তীরের ন্যায় আব্দুল্লাহর বক্ষ ছেদ করে বেরিয়ে গেল এবং তাকে গুলিবিদ্ধ হরিণীর ন্যায় আঘাত করে গেল।
এবার হৃদয়ের আভ্যন্তরীণ অনুভূতি জেগে ওঠল। সারা জীবনের জড়তার ময়লা আঁখি দিয়ে বন্যার মত বইতে লাগল। ওই অস্থির অবস্থায় আব্দুল্লাহ বিছানা হতে ওঠল এবং রাতের আঁধারে সব চেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু জাফরের ঘরে গেল। আব্দুল্লাহর অসময়ের আগমনে জাফর ঘাবড়ে ওঠল। সে তড়িৎ জিজ্ঞাসা করল, কোন তাৎক্ষণিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে হবে কি?
আব্দুল্লাহ অশ্র“ভেজা নয়নে উত্তর দিল, হ্যাঁ! আজ জীবনের সর্বাপেক্ষা বড় কাজের প্রস্তুতি বন্ধু। অতঃপর ফুঁসে-ফুঁসে কাঁদতে লাগল।
হঠাৎ তোমার কি হয়ে গেল সরদার? আব্দুল্লাহ ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বল্ল, ‘জাফর! এখন ভয়ানক ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। নিজের পঙ্কিল জীবন এবং তার ভয়াবহ পরিণতি ভাবনায় আমার অন্তর চূর হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর ওয়াস্তে বল যে, এক দাম্ভিক অপরাধীর মত জীবনের যে অংশ অতিবাহিত করেছি, তার ক্ষতিপূরণ কি সম্ভব? ওই বিশেষ দয়ার কি কোন সন্ধান পাওয়া যেতে পারে, যদ্ধারা আমলনামার কৃষ্ণতা ধোওয়ার জন্য শুধু লজ্জিত আঁখির এক বিন্দু অশ্র“ই যথেষ্ট।
জাফর আমি আঁধারে ফিরছি। আমাকে বাতি দেখাও। আমি আমার প্রভুর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে চাই। আমাকে পথ দেখাও। আমি আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত, আমার ক্ষতের ব্যণ্ডেজ বলে দাও।
এতটুকু বলতে বলতে আবদুল্লাহর শব্দ কন্ঠে আটকে গেল এবং সে নীরব হয়ে গেল। একজন সাহানুভূতিশীল সহায্যকারীর সুরে জাফর বল্ল, হৃদয়ের এ কোমল বিপ্লব, যন্ত্রণা-বেদনার এ নূতন মনযিল তোমাকে মোবারকবাদ সরদার। আফ্সোস! আপনার মত আমিও ওই গলির ঠিকানা অজ্ঞাত। অবশ্য এতটুকু জানি যে, খোদা-অন্বেষণে নির্গমনকারী সর্বপ্রথম কোন মুর্শিদে কামিলের খোঁজে বের হয়। তাঁকে পাওয়ার পর খোদা পাওয়ার অভিষ্ট অতি নিকটবর্তী হয়ে যায়। বিবৃত যে, খোদা পাওয়ার জন্য এ একটি মাত্র পন্থা আজও খোলা আছে; বাকি সব রাস্তা বন্ধ। আল্লাহর দিকে অগ্রসর হতে চাইলে তোমার জন্যও এছাড়া কোন উপায় নেই যে, কোন মুর্শিদে কামিলের দামান খোঁজ।
আমি শুনেছি যে, মুর্শিদে কামিলই কেবল ওই পথের উত্থান-পতন জ্ঞাত। মুর্শিদে কামিল ব্যতীত কেউই ওই পথ আজও অতিক্রম করেনি।
জাফরের কথায় আব্দুল্লাহর চক্ষু চমকে ওঠল, তার বিশুষ্ক চেহরা এমনি উজ্জল হয়ে গেল যেন নৈরাশ্যের আঁধারে আশার কোন কিরণ নজরে এল। এক হতভাগা কৃতজ্ঞের সুরে সে জাফরের সাহানুভূতির উত্তর দিতে গিয়ে বল্ল, বিজ্ঞ বন্ধু আমার! তুমি আমার যন্ত্রণাকাতর জখমে স্বস্তির ব্যণ্ডেজ রেখেছো। এখন যদিও আমি নৈরাশ নয় কিন্তু বন্ধু! কোন মুর্শিদে কামিলের সন্ধান পাওয়া-তো কঠিন ব্যাপার। ওই মুশকিলও তুমি আসান কর, কোন মুর্শিদে কামিলের নিদর্শন বল, তার গলিতে মাথায় হেঁটে যাবো।
আব্দুল্লাহর এ প্রশ্নে জাফর সমব্যথীর ন্যায় কেঁদে ওঠে বল্ল, “আমার মহানুভব বন্ধু! তুমি কৃতজ্ঞতা আদায় করে আমাকে লজ্জিত করোনা। বিশ্বাস কর, আমার কলিজার খুনে তোমার অন্তরের আগুন যদি নিভত, তবে আমি তজ্জন্যও প্রস্তুত। কিন্তু মুশকিল হল যে, এ আগুন পানিতে নয়, তজল্লীর ঝলকেই নিভে।
সরদার! তুমি এ বিষয়ে অজ্ঞাত নয় যে, আমিও তোমার পরিবেশ-পরিস্থিতি একই ছিল। তোমার মত আমিও ওই সকল নির্ঝর হতে দূরে সরে ছিলাম, যদ্ধারা ধ্যান-ধারণা ও আমলের পবিত্রতা লাভ ঘটে। অতএব, তোমার মত আমার কাছেও মুর্শিদে কামিল সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা নেই। অমনি আমার ধারণা যে, মুর্শিদে কামিলের তালাশও আল্লাহ অন্বেষণের সূচনা বিন্দু; সুতরাং তুমি যদি খোদার ওপর ভরসা করে ওই কাজে নেমে পড়, তবে খোদা অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবেন। এ পথ অতিক্রম করা যায়না সরদার! করানো হয়”।
নৈরাশ্যের অমানিশায় আব্দুল্লাহ এখন একা নয়, তার হাতে আশার বাতি জ্বলছে। জাফরের কথা শুনে অনুরাগের চাঞ্চল্যে আত্মভুলা অবস্থায় নিজের ঘরে ফিরে এল। রাত যথেষ্ট গভীর হয়েছে, আল্লাহর দয়ার ফিরিশতা আসমানের দরজা খুলতে ছিলেন, তারকারাজির আলোতে হঠাৎ এক নূরানী কাফেলা পৃথিবীর দিকে অবতরণ করতে দেখা গেল। হয়তো কোন সৌভাগ্যশীলের দু’আ আজ কবুলের মর্যাদায় ধন্য হবার আছে।
আব্দুল্লাহ আপন কুটিরের আঁধার কোণে বসে কাঁদতেছিল। কখনো কখনো হাঁফানির মাধ্যখানে দুঃখ-কষ্টে ডুবন্ত এ শব্দও শুনা যায়, ‘হে দয়া ও ক্ষমাশীল! একজন লজ্জিত অপরাধীকে আপন রহমতের বিস্তৃত দামানে আশ্রয় দিন। ওহে ভাগ্যহতদের ভরসাস্থল! নিজের কৃষ্ণকর্মময় জীবন হতে তাওবা করে আজ আমি আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি। আপনি আপনার উচ্চতা থেকে এক ফরিয়াদির আহ্বান শুনুন। হে ভগ্নমনের ভগ্ন আয়না জোড়া দানকারী! সকল দিক থেকে ফিরে তোমার পথে পা বড়িয়েছি; পৌঁছে দিন কোন মুর্শিদে কামিল, যিনি আমাকে আপনার দ্বার পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। ওহে অমুখাপেক্ষী প্রভু! আমি তোমার দ্বারে ফুটে ফুটে কাঁদবো, অস্থির ছটফট করবো এবং কাতর ফরিয়াদ করবো; যাবৎনা তুমি আমার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।’
রাত নিশীথ। আব্দুল্লাহ তড়িৎ দু‘আ শেষ করে চতুর্দিকে বেদনাবিধুর দৃষ্টিতে দেখে আল্লাহর নাম নিয়ে ঘর হতে বেরিয়ে পড়ল। আল্লাহর অন্বেষণে তার অনন্ত যাত্রার এটি ছিল সূচনাবিন্দু। অলি-গলি অতিক্রম করে সে এক চৌরাস্তায় এসে দাঁড়াল। অজানা ভাবে হৃদয় বলে ওঠল যে, সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওটিই মুর্শিদে কামিলের সাক্ষাতের স্থান। অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে যথেষ্ট সময় বয়ে গেল, তারকারাজির আলো নিভু-নিভু হল। আশা-নিরাশার দোলাচালে কয়েক মুহূর্ত পর অল্প দূরে একটি ছায়া নড়াচড়া করতে দেখা গেল। হঠাৎ হৃদয় আওয়াজ দিল, মুর্শিদে কামিল আসছেন। পদচুম্বনের জন্য আগ্রহী দৃষ্টি ঝুঁকল, ভক্তি-বিশ্বাস পা বাড়াল, আশা-ভরসা স্বাগতম জানাল এবং নিকটে পৌঁছে সে বে-খুদীতে ডাক দিল, “মুর্শিদে কামিল! কতক্ষণ ধরে আমি আপনান অপেক্ষা করছি, আসুন আমার নিকটে আসুন ! আমার হৃদয়রাজ্যে রাজত্ব করুন। আমাকে মুরিদ করুন। আমাকে বিনামূল্যে কিনে নিন, আমি আমার জীবন আপনার হাতে বিক্রয় করছি। আমাকে আপনার বাঁকা যুলফি ও চন্দ্রমুখের দাস বানিয়ে নিন। আমি আমার ললাটশত্র“ স্বাধীনতাকে আপনার কদমে উৎসর্গ করছি”।
আগন্তুক আশ্চর্য হয়ে উত্তর দিল, ভাই! আমি তোমার কথা বুঝতে পারছিনা। তুমি যার অপেক্ষা করছ, আমি সে নয়। আমি আঁধার রাতের ভ্রমণকরী। আমাকে পথ ছেড়ে দাও, তোমার আশা-ভরসার কেন্দ্র অন্য কেউ।
আবদুল্লাহ দামান আঁকড়ে ধরে বল্ল, আমি কার জন্য অপেক্ষা করছি, আমার আশার কেন্দ্র কে, তা জানা আপনার কাজ নয়, আমারই কাজ।
খোদার একজন বিদ্রোহী বান্দাকে খোদার নিকটে পৌঁছে দেওয়া আপনার সত্তার সব চেয়ে বড় দায়িত্ব, মুর্শিদ! বিলম্ব করোনা, আমাকে শীঘ্র মুরীদ করে নেন, যাতে এক মুহূর্ত নষ্ট করা ছাড়া আপনার দিকনির্দেশনায় আমার সফরের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়ে যায়।
আগন্তুক ক্ষণিক গম্ভীর হয়ে বলল, আমার ভইয়া! আমি তোমাকে বলছি যে, তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ। আমি ওই পথের লোক নই। আমার পেশা কি, তুমি জানতে পারলে আমার মুখে থুথু দেবে। সুতরাং ভাল হবে যে, তুমি আমার পথ হতে সরে যাও। যে কাজে আমি আজ ঘর হতে বেরিয়েছি, এখন তার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে; আমার সাথীরা আমার অপেক্ষায় রয়েছে।
সহস্র অনীহ-অস্বীকার সত্ত্বেও আব্দুল্লাহ আপন অবস্থানে অনড় এবং কোন ভাবেই তার দামান হতে পৃথক হতে প্রস্তুত নয়।
আগন্তুকও বিপদে পড়ে গেল। সে এক অপরিচিত পাগলের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ারর কৌশল খুঁজছে, হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বল্ল, “আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যখন মানতেই চাচ্ছনা, আমি তোমাকে মুরীদ করে নিলাম। এখন আজ হতে তুমি আমার হাতে বিক্রিত। যে ভয়ঙ্কর পথে তুমি পা বড়িয়েছ, তা নিরাপত্তার সাথে অতিক্রমের জন্য জরুরি যে, তুমি তোমার মুর্শিদের শর্তহীন আনুগত্য করবে। আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, আমি না ফেরা পর্যন্ত এক কদমও এদিক ওদিক দেবেনা। বিশ্বাস রাখ, ফিরে এসে আমি তোমাকে ওই পথ অতিক্রম করিয়ে দেব, যা আল্লাহর দ্বার পর্যন্ত পৌঁছায়। এখন আমাকে যেতে দাও”।
এ কথা বলে আগন্তুক যে পথে এসেছিল, ওই পথেই ফিরে গেল। যতক্ষণ তাকে দেখা যাচ্ছিল, ততক্ষণ আব্দুল্লাহর দুঃখ ভারাক্রান্ত দৃষ্টি তার পদচুম্বন করতে থাকল।
সকাল হয়ে গেল এবং আব্দুল্লাহ অপেক্ষা করতে ছিল। বেলা গড়িয়ে যাওয়া পর্যন্ত শহরের প্রসিদ্ধ একজন লোক ঘন্টার পর ঘন্টা এক স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা মামুলি বিষয় ছিলনা। চতুর্দিক হতে মানুষের ভিড় জমে গেল। তাঁকে নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য লোকেরা হাজারো বুঝাল, কিন্তু প্রত্যেকের জন্য তার নিকট একটিই উত্তর ছিল,
আমার অস্তিত্বের শাসক আমার মুর্শিদে কামিল আমাকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন যে, যতক্ষণ আমি ফিরে না আসি, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। এখন তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত আমি এখান থেকে সরতে পারবোনা। তিনি ওয়াদাহ দিয়ে গিয়েছেন যে, আমাকে আল্লাহর দ্বার পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন।
লোকেরা বুঝাতে লাগল যে, রাত শেষ হয়েছে, এখন দিনের শেষ প্রহর চলছে, সে আসার হলে এতক্ষণে এসে পড়ত, এখন তার জন্য অপেক্ষা অহেতুক কালক্ষেপণ মাত্র। সে তোমার সাথে মিথ্যা অঙ্গিকার করে গিয়েছে। আব্দুল্লাহ অটল বিশ্বাসের ভঙ্গিতে উত্তর দিল, আপন মুখ পাপমলিন করোনা। মুর্শিদে কামিল কখনো মিথ্যা বলেন না। তিনি অবশ্যই ফিরে আসবেন। বিদায়ের সময় তিনি কোন সময় নির্দিষ্ট করেননি; সতুরাং তাঁর ফেরার সময় ক্বিয়ামত পর্যন্ত। তোমরা আমার পথ হতে সরে যাও, আমি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাঁর অপেক্ষা করবো। দুনিয়ার সবকিছু চলমান ছিল। কত সন্ধ্যা এল গেল, কত সূর্য উদিত হয়ে আবার ডুবে গেল, কিন্তু আব্দুল্লাহ আপন জায়গায় দাঁড়ানো ছিল দাঁড়ানো আছে। এখন সে এলাকার ঘৃণ্য অপরাধী নয় বরং ভক্তি-ভরা দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। সহস্র ভক্ত সর্বদা তাকে আবেষ্টন করে আছে। মুর্শিদে কামিলের অপেক্ষায় এখন সে একা নয়, পাগলের বিরাট একটা দলও সঙ্গে রয়েছে।
পূর্ণিমার রাত, চাঁদ পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। সমস্ত শহর নীরব, সঙ্গের সবাইও তন্দ্রাচ্ছন্ন। পরন্তু আব্দুল্লাহ রীতিমত দাঁড়ানো ছিল এবং তার দু’চোখ অপেক্ষায় খোলা। হঠাৎ সে কোন আগন্তুকের পদধ্বনি অনুভব করল। ফিরে দেখল সফেদ ‘আবায় আবৃত এক বুযুর্গ হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখের মাহত্ম্য, কপালের ঔজ্জ্বল্য এবং চেহরা হতে বর্ষমান নূর বলে দিচ্ছে যে, মানবাকরে আসমানের ফিরিশতা নেমে এসেছেন।
আল্লাহ প্রদত্ত মহত্বের ধমকে আব্দুল্লাহর দৃষ্টি অবনমিত হল। অন্তর এক অজানা প্রভাবে বিভোর হয়ে গেল। আগন্তুক বুযুর্গ অনুযোগপূর্ণ ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে কেন দাঁড়িয়ে রয়েছ? অবনমিত দৃষ্টিতে আব্দুল্লাহ উত্তর দিল, মুর্শিদে কামিলের অপেক্ষায়। আগন্তুক ফের জিজ্ঞাসা করলেন কোন মুর্শিদে কামিল?
আব্দুল্লাহ সাহস করে উত্তর দিলেন, ওই মুর্শিদে কামিল, যার হাতে আমি মুরীদ হয়েছি। তিনি আমার সাথে অঙ্গিকার করেছেন, তুমি এখানে অপেক্ষা কর, আমি ফিরে এসে তোমাকে আল্লাহর দ্বারে পৌঁছে দিব।
নবাগন্তুক বুঝাবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘প্রিয়! সে মুর্শিদে কামিল নয়, আঁধার রাতের পথিক, আল্লাহর দরবারের রাস্তা স্বয়ং তার অজানা, সে তোমার পথপ্রদর্শন কি করবে? এখন সে আর ফিরে আসবেনা, অহেতুক তার অপেক্ষায় নিজের প্রাণ ধ্বংস করোনা’।
আব্দুল্লাহ তাগিদ দিয়ে বল্লেন, আমার হৃদয়ের বিশ্বাস কোন ভাবেই প্রকম্পিত হতে পারেনা যে, তিনি অবশ্যই আসবেন এবং আল্লাহর দরবারের পথ তার জানা আছেই। মুর্শিদে কামিল কখনো মিথ্যা বলতে পারেননা।
নবাগন্তুক বুযুর্গ সতর্ক করার ভঙ্গিতে বললেন, একটি ভুল বিষয়ে জেদ করোনা। মারাত্মক প্রতারণার শিকার হয়েছ তুমি। নিজের অজ্ঞতায় এক চোরকে মুর্শিদে কামিল মনে করে বসেছ। ঘুমন্ত মানুষের চোখের কাজল চোরও যদি মুর্শিদে কামিল হতে পারে, তবে দুর্ভাগা দুনিয়ার এ রূপ মুর্শিদে কামিলের কোন প্রয়োজন নেই। আফ্সোস তোমার নির্বুদ্ধিতার ওপর!
এখন আব্দুল্লাহর ধৈর্যের নিক্তি টলছে, মুর্শিদে কামিলের বিরুদ্ধে কথার এ তীর সহ্য হলনা, সে ফুঁসে-ফুঁসে কাঁদছে। কোন মতে কান্না সংবরণ করে ব্যথা-বেদনার অনলে জ্বলে ওঠে বল্ল, কঠিন আফসোস যে, এক দিকেতো আপনার আপাদমস্তক হৃদয়ে ফিরিশতা জগতের প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিল আর অন্য দিকে মুর্শিদে কামিলের তিরস্কার করছেন! এত পবিত্র হয়ে আপনার এ রীতি বুঝে আসছেনা। বেয়াদবী মনে না করলে হলে আপনার পবিত্র নাম জানার মর্যাদা অর্জন করতে পারি?
নবাগন্তুক বুযুর্গ সাহাস্যে বললেন, আমার নাম শুনে যদি তোমার কোন উপকার হয় তবে শুন যে, আমাকে ‘খিদ্বর’ বলা হয়। পথভুলা মুসাফিরকে সঠিক রাস্তায় ফিরিয়ে আনা আমার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব; এ সূত্রেই আমি তোমাকে বুঝিয়েছি। নাম শুনেই আব্দুল্লাহ পদচুম্বন করল। ‘আবার দামান চোখে লাগাল এবং আদবের প্রাবল্যে কাঁপতে-কাঁপতে বল্ল, আজ আমি নিজের সৌভাগ্যের ওপর যতই আনন্দ করি কম হবে যে, কোন মিনতি-ফরিয়াদের কষ্ট ছাড়া ওই জীবন সঞ্চারক ঝলকে আমার আঁখি তৃপ্ত হচেছ! সে সাথে এ আবেদনের অনুমতি দিন যে, যে মুর্শিদে কামিলকে চোর বলা হচ্ছে, তার হাতে মুরীদ হওয়ার পরই আমার এ সৌভাগ্য লাভ হয়েছে। ওই “চোর” এর সম্পর্কের এ সম্মান কি আমার জন্য গর্বযোগ্য নয়? সৌভাগ্য যে, আপনার আগমনে মুর্শিদে কামিলের ওপর আমার বিশ্বাস আরো দৃঢ় হল।
হযরত খিদ্বর স্নেহমাখা সুরে বললেন, ফের তুমি ভুলের দ্বিরুক্তি করলে, আমি মুর্শিদে কামিলকে চোর বানাচ্ছিনা; তুমি এক চোরকে মুর্শিদে কামিল বানিয়ে নিয়েছ। অবশ্যই আল্লাহর মর্জির এমন নিদর্শন অনুমিত হচ্ছে যে, শেষতক তোমার জেদে “চোর” কেই মুর্শিদে কামিল বানিয়ে দেওয়া হবে। প্রকৃত অন্বেষীর এ পাগলামি ও অনুরাগ-আকর্ষণের এ উদ্যম শয়তানের প্রতারণা হতে সংরক্ষিত থাকলে তবে সুসংবাদ শুনে নাও যে, এ স্থানে মুর্শিদে কামিলের সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে। সাক্ষাতের কয়েক মুহূর্ত পর তুমি আল্লাহর মহান দরবারে ইরফান বা খোদা পরিচয়ের নিরিবিলিতে সৌভাগ্য মণ্ডিত হবে। ওই প্রাণদীপ্ত ক্ষণের অপেক্ষায় থাক, যখন তোমার হৃদয়ের ভূমিতে আল্লাহর তজল্লীর আর্শ বিছানো হবে। সর্বশক্তিমান প্রভু তোমার উম্মাদ-উদ্যম সংরক্ষণ করুন। এ বলে হযরত খিদ্বর ফিরে গেলেন এবং দু’কদম  চলে আদৃশ্য হয়ে গেলেন। অল্পক্ষণ পর সকালের শুভ্রতা পরিস্ফুটিত হল এবং রাতের আঁধার বিদূরিত হতে লাগল। আজ বহুদিন পর আব্দুল্লাহর ক্ষণিকটা নিদ্রা এল। চোখ লেগে আসতেই সে দেখল যে, ভাগ্য-কারিকর আল্লাহর আর্শের ছায়ায় দাঁড়ানো, হঠাৎ আল্লাহর মহানত্বের পর্দা হতে একটি আওয়াজ বেরুল; অমনি আল্লাহর মহানত্বের ভয়ে উর্ধ্ব জগতের ফিরিশ্তা সিজদায় পতিত হল।
আঁধার রাতের ডাকু অথবা আব্দুল্লাহর মুর্শিদে কামিল ইহইয়ার মনে আজ আনন্দ ধরেনা। মনোরম নগরী বাগদাদ সম্পর্কে সে বহু কথা শুনতে পেয়েছে। বহুদিনের আশা যে, একবার এ ধনী শহরে গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষার। আজ কতেক সাহসী সাথীর সাহায্যে বাগদাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচীর সিদ্ধান্ত হল।
পরামর্শ মতে অতি প্রত্যুষে বাগদাদ যাত্রার সিদ্ধান্ত ছিল বলেই রাতেই সবাই এক স্থানে একত্রিত হয়েছিল। আলো ফুটতেই আঁধার রাতের চোরের দল বাগদাদ অভিমুখে যাত্রা দিল।
বাগদাদ যত নিকটবর্তী হচ্ছিল, অজ্ঞাতভাবে ইহইয়ার প্রাণস্পন্দন ততই বেড়ে যাচ্ছিল। নিজের এ অস্থিরতার কথা সাথীদের বার কয়েক বল্লেই কেউ সেদিকে বিশেষ কর্ণপাত করলনা।
দিবা-রাত্র কয়েকদিন চলার পর বাদগাদ কেবল এক মনযিলের দূরত্বে রইল। সন্ধ্যা নেমে এল। এক উপত্যকা ডিঙ্গিয়ে তারা পর্বত চূড়ায় ওঠল। সামনেই বাগদাদের সুন্দর শহর ঝিকমিক করছে। অভীষ্টে দৃষ্টি পড়তেই হৃদয় হর্ষিত এবং প্রাণ নেচে ওঠল। অল্পক্ষণ পর ওই দস্যু-দল বাগদাদে প্রবেশ করল। একটি বিস্তৃত ময়দান অতিক্রম কালে এক সুরম্য অট্টালিকা দেখা গেল। দরজায় বাহনের ভিড়, ঘোড়ার সারি, উটের পাল দেখে ইহইয়া (আব্দুল্লাহর মুর্শিদে কামিল) হাঁটতে-হাঁটতে দাঁড়িয়ে গেল। তার অনুমান ভুল ছিলনা যে, এটি শহরের সর্বাপেক্ষা বড় সরদারের ঘর। পাশে দাঁড়িয়েই এক পথচারীকে জিজ্ঞাসা করল, এটি কি শহরের কোন বড় সরদারের ঘর? উত্তর পেল যে, শুধু শহরের নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের সব চেয়ে বড় সরদারের ঘর। আজ পর্যন্ত তাঁর ধনভাণ্ডারের শেষ কেউ নাগাল পায়নি। তাঁর কদমের নীচে সোনাÑচাঁদির খনি বিস্তৃত। সপ্ত মহাদেশের রাজত্ব তাঁর ঘরের এক সাধারণ দাসীরও হস্তাগত। বায়ুমণ্ডল, সাগর-মহাসাগর, পাহাড় ও তেপান্তর সর্বত্র তাঁর কর্তৃত্ব-মহাত্মের ঝাণ্ডা ওড়ছে। পথচারীর কথা শুনে তার দেমাগ এক অজ্ঞাত ভীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আশ্চর্যান্বিতার প্রাবল্যে তার চক্ষু স্থির হয়ে রইল। বড় কষ্টে জিজ্ঞাসা করল, ওই সরদারের নাম কি?
পথচারী বল্ল, এক নাম হলেতো বলা যায়, অসংখ্য নাম কি বলবো! দস্তগীরে কাওনাইন বা উভয় জগতের সাহায্যকারী, মখদুমুল ওয়ারা, শায়খুস্ সাকলাইন, খাজায়ে কায়েনাত, কুতবুল আকতাব, গাউসুল আ’যম, ইমাম জীলানী, মাহবূবে সুবহানী; এ ধরনের নামাবলীর এক সোনালী ধারা তাঁর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট। পথচারী দ্রুত উত্তর দিল এবং মুহূর্ত কাল অপেক্ষা না করেই আগে চলল।
ইহইয়া বিজয়ীর ঢঙে সাথীদের বল্ল, মনে হয় আজ ভাগ্যের সেতারা উর্ধ্ব-কক্ষপথে রয়েছে; এত বড় ধনীর গৃহের ধূলি-বালি হস্তাগত হলেও সারা জীবনের জন্য যথেষ্ট। অর্ধরাত পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনার পর সমূহ প্রস্তুতি সম্পন্ন হল। ইহইয়া অত্যন্ত চতুরতায় সকলের দায়িত্ব বন্টন করে দিল। আজ কেন জানি গাউসুল ওয়ারা (রা.)’র খানকাহের পেছনের দরজা খোলা ছিল। রাত যথেষ্ট গভীর; সারা বাগদাদ নীরব নিদ্রায় নিমগ্ন ছিল। কোথাও কোথাও নৈশ-প্রহরীর শব্দ শুনা যাচ্ছে।
ইহইয়া সন্তর্পণে পিছনের দেওয়ালের দিকে এগোল এবং দরজা খোলা দেখে তার চোখ খুশিতে চমকে ওঠল। অন্তরের দ্রুত-স্পন্দন নিয়ে হিম্মত করে ভিতরে প্রবেশ করল। আঁধারে বহুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরল, কিন্তু কিছুই পেলনা। বিষম আশ্চর্য হল যে, এত বড় সরদারের ঘর আর সম্পূর্ণই খালি! অকৃতকার্যতার অনুশোচনা নিয়ে ফেরার সময় ভাবল যে, কেন এ ঘরের ধূলি-বালি নিচ্ছিনা, হতে পারে তাতে সোনা-চাঁদির চূর্ণ লুকিয়ে আছে।
চতুর্দিক হতে ধূলি-বালি কুড়িয়ে ছোট্ট গাঁটরি বেঁধে বাইরে পা রাখতেই হঠাৎ আঁখি তলে আঁধার ছেয়ে গেল। কয়েকবার পলকপাতের পর অনুভব করল যে, চক্ষুজ্যোতি বিদূরীত হয়েছে। ভীত হয়ে বসে পড়ল। কলিজা কেঁপে ওঠল। আগ বাড়ার হিম্মত রইলনা। অমনি নিকট থেকেই প্রহরীর শব্দ কানে এল। ভীত সন্ত্রস্ত ফের ঘরের ভিতর ফিরে এসে এক কোণায় লুকিয়ে বসে গেল। দু’ জগতের সাহায্যকারী গাউসুস্ সাকলাইন (রা.) তাহাজ্জুদের নামায সমাপন করে অবসর হলেন। শশীমুখ হতে নূরের কিরণ বিচ্ছুরিত হচ্ছে। কপালের তরঙ্গে অনুগ্রহ ঢেউ খেলছে। কাজলমাখা আঁখি হতে জ্যোতির নির্ঝর উৎলে ওঠছে। হৃদয়ের আলোকদীপ্ত প্রদীপ বেলায়ত রাজ্যের চিত্রগৃহকে চমকিত করছে।
সম্মুখে অদৃশ্যের  সিংহ পুরুষরা হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। একজন প্রতিনিধি এগিয়ে এসে বললেন, মহারাজ! অমুখ শহরের এক আবদাল ইন্তিকাল করেছেন। সত্যবাক মুখে দয়ানুগ্রহের দু‘আ করতঃ গাউসুল ওয়ারা (রা.) সম্মুখে এগোলেন। হঠাৎ কারো পদধ্বনি শুনে ইহইয়া কেঁপে ওঠল এবং পলাতে ইচ্ছা করে পরিণতি চিন্তায় আবার বসে পড়ল।
“আজ আমার ঘরে কোন অতিথি আছে” হৃদয়রাজও জয়করা ধ্বনি কানে এল। আশা-নিরাশার দোলাচালে চুপ থাকার পর আত্মসমর্পণকারী অপরাধীর ন্যায় তার মুখ থেকে বেরুল, “মহারাজ! আমি এক দুর্ভাগা! আঁধার রাতের ডাকু; আল্লাহ প্রদত্ত ধনরাজির প্রসিদ্ধি শুনে এখানে এসেছি। অধিকন্তু সমস্যার বেড়াজালে আটকে পড়েছি। এখন জীবনের সবচেয়ে বড় মাতম যে, এখানে এসে নিজের চক্ষুজ্যোতি হারিয়ে বসেছি। আহা! জগতের বড় সরদারের ঘরে কতইনা আশা নিয়ে এসেছিলাম; এখন না জানি অদৃষ্টে কি আছে!” এতটুকু বলতে বলতে তার কন্ঠে শব্দ আটকে গেল এবং সে ফুঁসে-ফুঁসে কাঁদতে লাগল।
কেঁদোনা! অনুগ্রহের দর্পণ বড়ই কোমল হয়ে থাকে; সামন্য আঘাতে ঘায়েল হয়ে যায়। আমার দামানে চোখ মুছে নাও। এটা নিরাশ বঞ্চিতদের আশ্রয়স্থল। এখানে অপরাধীকে শাস্তি নয়, হৃদয় পবিত্র করা হয়। আমার দ্বারের আশাবাদী আজতক শূন্য হাতে ফিরেনি। ধৈর্য ধারণ কর। চক্ষুজ্যোতি লাভসহ প্রত্যাবর্তিত হবে। এটা বলতে বলতে গাউসুল ওয়ারা (রা.) পুরোপুরি তার কাছে এসে গেলেন। দ্বিতীয় মুহূর্তে দয়ার কার্যকারক দৃষ্টি ওঠল এবং তার জ্যোতিহীন চক্ষুপথে হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছল। বেশ! মুহূর্তেই খোদা পরিচয়ের সমস্ত সূক্ষ্মতত্ত্ব উদ্ভাসিত হয়ে গেল এবং পলক পড়তেই সে আলমে লাহূতের শেষ সীমানায় দাঁড়ানো। এখন সে আঁধার রাতের ডাকু নয়, বেলায়ত রাজ্যের মুকুটধারী।
গাউসুল ওয়ারা (রা.)’র পক্ষ থেকে নির্দেশ জারী হল, এখনই খবর এল যে, অমুক শহরের আবদালের ইন্তিকাল হয়েছে। আজ থেকে ওই স্থানে তোমাকে বহাল করা হচ্ছে। তড়িৎ গিয়ে আপন পদবীর দায়িত্ব সামলাও। এক অথৈ প্রেমাবেগে ঝুঁকে সে শাহানশাহে বাগদাদ (রা.)’র পদচুম্বন করল এবং উল্টা কদমে ফিরে গেল।
দরজায় পৌঁছে বাইরে কদম ফেলতেই অদৃশ্যের সিংহ পুরুষদের সমাবেশ হতে আওয়াজ এল, “শেষতক এক পাগলের উদ্যম চোরকে ‘মুর্শিদে কামিল’ বানিয়ে ছাড়ল”। ফের ওই সড়ক দিয়ে আজ সে চলছে, যে পথে চলে সে হাকীকতের পরিচিতির মহাসমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছেছিল। পরন্তু পায়ের নীচে মাটি নয়, জগৎবাসীর হৃদয় বিছানো রয়েছে। কয়েক কদম যাওয়ার পর শহরের দালান দেখা যাচ্ছিল; জনবসতির এক চৌরাস্তায় সহস্র লোকের ভিড় দৃশ্যমান। এক ভিনদেশী পথচারী মনে করে লোকেরা তাকে পথ দেখিয়ে বল্ল, ভিড়ের কারণে এ দিকের আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে; আপনি অন্য কোন পথ ধরে যান। ইহইয়া জিজ্ঞাসা করল, এখানে এটা কিসের ভিড় যে, পথচারীর আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে?
লোকেরা আশ্চর্যান্বিত-সুরে বল্ল, “কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল, এ ঘটনা ‘টক অব দ্যা টাউন’ আর আপনার খবরই নেই! কতই আশ্চর্য!”
ইহইয়া বল্ল, আমি এ শহরের বাসিন্দা নই। আমাকে প্রকৃত ঘটনা খুলে বলুন। লোকেরা বল্ল, আমাদের শহরের এক সুস্থ-সবল ব্যক্তি কয়েক সপ্তাহ ধরে পাগল হয়ে গিয়েছে। এ চৌরাস্তায় দিন-রাত দাঁড়িয়ে থাকে। সে বলে যে, আমি মুর্শিদে কামিলের অপেক্ষায় এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি আমার সাথে ওয়াদা করে গিয়েছেন যে, তুমি এখানে আমার জন্য অপেক্ষা কর; আমি ফিরে আসার পর তোমাকে আল্লাহর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিব। তাকে হাজারো বুঝানো হয়েছে যে, সে আর ফিরে আসবেনা। সকলকে এ উত্তরই দেয় যে, মুর্শিদে কামিল মিথ্যা বলতে পারেননা; কখনো না কখনো তিনি অবশ্যই আসবেন। হৃদয়ের আকর্ষণ তার প্রতি এতই বেড়ে গিয়েছে যে, এখন সে একা নয়, তার চতুর্পাশে পতঙ্গের মেলা লেগে থাকে। লোকদের কথায় হঠাৎ তার স্মৃতি সতেজ হল এবং সে রাতের সমস্ত ঘটনা দৃষ্টির সামনে ভেসে ওঠল। ভালভাবে দেখতেই মনে পড়ল, এ চৌরাস্তাতেই এক পাগলের সাথে তার দেখা হয়েছিল, সে তাকে হাত ধরে মুরিদ করিয়েছিল এবং ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষার নির্দেশ দিয়েছিল। এ সমস্ত ঘটনা মনে পড়তেই সে আত্মহারা হয়ে গেল। ভাবাবেগ সামলাতে পারলনা। প্রবল অনুরাগে জামা ছিঁড়তে-ছিঁড়তে শোরগোল করতে করতে মাজমার  দিকে দৌঁড়ে গেল এবং ভিড় ফাঁক করে অব্দুল্লাহর নিকট পৌঁছে আওয়াজ দিল, ‘আমি এসে পড়েছি, আমি এসেছি, হে আমার মুরিদ! আমি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে এসেছি’। চেনা-জানা শব্দ শুনে আব্দুল্লাহ হতচকিত হল। চেহরায় দৃষ্টি পড়তে স্বতঃস্ফূর্ত চিৎকার দিল।
মুর্শিদে কামিল এসে গিয়েছেন! মুর্শিদে কামিল এসেছেন! আমি বলে ছিলাম, মুর্শিদে কামিল মিথ্যা বলেননা, তিনি অবশ্যই আসবেন। এ কথা বলতে বলতে ব্যাকুল হয়ে মুর্শিদে কামিলের বুকে জড়িয়ে গেল। বহু দিনের পিপাসাকাতর একটি প্রাণ খোদাপরিচয়ের নির্ঝর হতে তৃষ্ণা মিটাচ্ছিল আর তজল্লীর এক নূতন জগত দৃষ্টির সামনে চমকাতে ছিল। আলিঙ্গনাবদ্ধ কয়েক মুহূর্ত কেটে যেতেই মুর্শিদে কামিল আওয়াজ দিল,
আব্দুল্লাহ! চক্ষু মেলো! তুমি আল্লাহর চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছ। চোখ খুলতেই আব্দুল্লাহ সিজদায় লুটে পড়ল। দৈববাণী এল, ‘শেষ পর্যন্ত এক পাপী বান্দা প্রেমের আহাজারি ও ফরিয়াদের মনোদাহ আর তাপে আপন রুষ্ট মাওলাকে সন্তুষ্ট করেই নিয়েছে’।
‘তপন কিরণ স্বয়ং অস্থির প্রেমের আকর্ষণে;
নইলে হাকীকত সবই জানা অণুর উড্ডয়নের’।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

প্রেমাস্পদের গলি

Update Time : ০৪:৪৭:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ অগাস্ট ২০২৫

✍️ প্রমিত মুন্তাসির পান্থ 

(আরশাদুল ক্বাদেরী (রহ.)’র লালাঃযার অবলম্বনে)
আব্দুল্লাহ ইরাকের প্রসিদ্ধ ডাকাত: লুট-পাট, ছিনতাই ও অত্যাচার- হত্যা ইত্যাদি তার পেশা। সে আজ এক ভয়ানক অভিযান হতে ফিরে নিজ ঘরে এল। অনেক রাত অতিবাহিত হল। সাঙ্গ-পাঙ্গরা বিদায়ের বেলায় জিজ্ঞাসা করল, সরদার! দ্বিতীয় অভিযানের প্রস্তুতি কখন হবে?
না জানি আজ কে যে, এ প্রশ্নে আব্দুল্লাহর চেহরায় আনন্দের কোন চিহ্ন ফুটে ওঠলনা। সে অত্যন্ত অন্যমনষ্কতায় উত্তর দিল, “এখন কিছু বলা যাচ্ছেনা। প্রস্তুতির সংবাদ সময়ের পূর্বে তোমাদের দেওয়া হবে”।
সঙ্গী-সাথীদের বিদায় দিয়ে সে যখন শয্যাগত হল, তখন এক অজানা যন্ত্রণায় তার অন্তর ভারাক্রান্ত ছিল। সহস্র প্রচেষ্টায় তার ঘুম আসছিলনা। কয়েক মুহূর্ত পর মনে হল কেউ তার অন্তর দ্বারে করাঘাত করছে, সে অবাক হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত বিছানায় ওঠে বসল। অলসতার নিদ্রা অতি গভীর ছিল, তাই মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু এবার অন্তরের বদ্ধদ্বার খানিকটা উম্মুক্ত হয়েছিল এবং অদৃশ্য আহ্বানকারীর কানাঘুষার জন্য একটু ফাঁক সৃষ্টি হল।
হঠাৎ অন্তরের ছিদ্র দিয়ে কেউ চুপিচুপি বলে ওঠল, জালেম! একটু পেছনে তাকিয়ে দেখ। তোমার জীবন লিপির প্রতিটি পৃষ্ঠা কাল হয়ে গিয়েছে। মজলুমদের উফ্ শব্দ, নিস্পাপদের রক্ত এবং পাপের বোঝায় তোমার উদ্ধত ঘাড় মচকিতে বসেছে। মৃত্যুর পর যখন একজন দাম্ভিক অপরাধীর মতো তোমাকে মহাপরাক্রমশীল আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত করা হবে, তখন তাঁর মহানত্বের মহত্বের ভয়ে তোমার কলিজা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। পরিণতির আপমান ও জাহান্নামের ভয়ানক শাস্তি হতে বাঁচতে চাইলে এখনও সময় আছে। ওঠ, নিজের মাটির এ দেহ হতে শয়তানের  জামা খুলে ফেলে দাও। ক্ষমা ও দয়ার দ্বার এখনও খোলা আছে। যে করেই হোক নিজের অসন্তুষ্ট মাওলাকে রাজি করে নাও। অদৃশ্য বাণীর এ অস্ফুট আহ্বান অতি তীক্ষè তীরের ন্যায় আব্দুল্লাহর বক্ষ ছেদ করে বেরিয়ে গেল এবং তাকে গুলিবিদ্ধ হরিণীর ন্যায় আঘাত করে গেল।
এবার হৃদয়ের আভ্যন্তরীণ অনুভূতি জেগে ওঠল। সারা জীবনের জড়তার ময়লা আঁখি দিয়ে বন্যার মত বইতে লাগল। ওই অস্থির অবস্থায় আব্দুল্লাহ বিছানা হতে ওঠল এবং রাতের আঁধারে সব চেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু জাফরের ঘরে গেল। আব্দুল্লাহর অসময়ের আগমনে জাফর ঘাবড়ে ওঠল। সে তড়িৎ জিজ্ঞাসা করল, কোন তাৎক্ষণিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে হবে কি?
আব্দুল্লাহ অশ্র“ভেজা নয়নে উত্তর দিল, হ্যাঁ! আজ জীবনের সর্বাপেক্ষা বড় কাজের প্রস্তুতি বন্ধু। অতঃপর ফুঁসে-ফুঁসে কাঁদতে লাগল।
হঠাৎ তোমার কি হয়ে গেল সরদার? আব্দুল্লাহ ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বল্ল, ‘জাফর! এখন ভয়ানক ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। নিজের পঙ্কিল জীবন এবং তার ভয়াবহ পরিণতি ভাবনায় আমার অন্তর চূর হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর ওয়াস্তে বল যে, এক দাম্ভিক অপরাধীর মত জীবনের যে অংশ অতিবাহিত করেছি, তার ক্ষতিপূরণ কি সম্ভব? ওই বিশেষ দয়ার কি কোন সন্ধান পাওয়া যেতে পারে, যদ্ধারা আমলনামার কৃষ্ণতা ধোওয়ার জন্য শুধু লজ্জিত আঁখির এক বিন্দু অশ্র“ই যথেষ্ট।
জাফর আমি আঁধারে ফিরছি। আমাকে বাতি দেখাও। আমি আমার প্রভুর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে চাই। আমাকে পথ দেখাও। আমি আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত, আমার ক্ষতের ব্যণ্ডেজ বলে দাও।
এতটুকু বলতে বলতে আবদুল্লাহর শব্দ কন্ঠে আটকে গেল এবং সে নীরব হয়ে গেল। একজন সাহানুভূতিশীল সহায্যকারীর সুরে জাফর বল্ল, হৃদয়ের এ কোমল বিপ্লব, যন্ত্রণা-বেদনার এ নূতন মনযিল তোমাকে মোবারকবাদ সরদার। আফ্সোস! আপনার মত আমিও ওই গলির ঠিকানা অজ্ঞাত। অবশ্য এতটুকু জানি যে, খোদা-অন্বেষণে নির্গমনকারী সর্বপ্রথম কোন মুর্শিদে কামিলের খোঁজে বের হয়। তাঁকে পাওয়ার পর খোদা পাওয়ার অভিষ্ট অতি নিকটবর্তী হয়ে যায়। বিবৃত যে, খোদা পাওয়ার জন্য এ একটি মাত্র পন্থা আজও খোলা আছে; বাকি সব রাস্তা বন্ধ। আল্লাহর দিকে অগ্রসর হতে চাইলে তোমার জন্যও এছাড়া কোন উপায় নেই যে, কোন মুর্শিদে কামিলের দামান খোঁজ।
আমি শুনেছি যে, মুর্শিদে কামিলই কেবল ওই পথের উত্থান-পতন জ্ঞাত। মুর্শিদে কামিল ব্যতীত কেউই ওই পথ আজও অতিক্রম করেনি।
জাফরের কথায় আব্দুল্লাহর চক্ষু চমকে ওঠল, তার বিশুষ্ক চেহরা এমনি উজ্জল হয়ে গেল যেন নৈরাশ্যের আঁধারে আশার কোন কিরণ নজরে এল। এক হতভাগা কৃতজ্ঞের সুরে সে জাফরের সাহানুভূতির উত্তর দিতে গিয়ে বল্ল, বিজ্ঞ বন্ধু আমার! তুমি আমার যন্ত্রণাকাতর জখমে স্বস্তির ব্যণ্ডেজ রেখেছো। এখন যদিও আমি নৈরাশ নয় কিন্তু বন্ধু! কোন মুর্শিদে কামিলের সন্ধান পাওয়া-তো কঠিন ব্যাপার। ওই মুশকিলও তুমি আসান কর, কোন মুর্শিদে কামিলের নিদর্শন বল, তার গলিতে মাথায় হেঁটে যাবো।
আব্দুল্লাহর এ প্রশ্নে জাফর সমব্যথীর ন্যায় কেঁদে ওঠে বল্ল, “আমার মহানুভব বন্ধু! তুমি কৃতজ্ঞতা আদায় করে আমাকে লজ্জিত করোনা। বিশ্বাস কর, আমার কলিজার খুনে তোমার অন্তরের আগুন যদি নিভত, তবে আমি তজ্জন্যও প্রস্তুত। কিন্তু মুশকিল হল যে, এ আগুন পানিতে নয়, তজল্লীর ঝলকেই নিভে।
সরদার! তুমি এ বিষয়ে অজ্ঞাত নয় যে, আমিও তোমার পরিবেশ-পরিস্থিতি একই ছিল। তোমার মত আমিও ওই সকল নির্ঝর হতে দূরে সরে ছিলাম, যদ্ধারা ধ্যান-ধারণা ও আমলের পবিত্রতা লাভ ঘটে। অতএব, তোমার মত আমার কাছেও মুর্শিদে কামিল সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা নেই। অমনি আমার ধারণা যে, মুর্শিদে কামিলের তালাশও আল্লাহ অন্বেষণের সূচনা বিন্দু; সুতরাং তুমি যদি খোদার ওপর ভরসা করে ওই কাজে নেমে পড়, তবে খোদা অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবেন। এ পথ অতিক্রম করা যায়না সরদার! করানো হয়”।
নৈরাশ্যের অমানিশায় আব্দুল্লাহ এখন একা নয়, তার হাতে আশার বাতি জ্বলছে। জাফরের কথা শুনে অনুরাগের চাঞ্চল্যে আত্মভুলা অবস্থায় নিজের ঘরে ফিরে এল। রাত যথেষ্ট গভীর হয়েছে, আল্লাহর দয়ার ফিরিশতা আসমানের দরজা খুলতে ছিলেন, তারকারাজির আলোতে হঠাৎ এক নূরানী কাফেলা পৃথিবীর দিকে অবতরণ করতে দেখা গেল। হয়তো কোন সৌভাগ্যশীলের দু’আ আজ কবুলের মর্যাদায় ধন্য হবার আছে।
আব্দুল্লাহ আপন কুটিরের আঁধার কোণে বসে কাঁদতেছিল। কখনো কখনো হাঁফানির মাধ্যখানে দুঃখ-কষ্টে ডুবন্ত এ শব্দও শুনা যায়, ‘হে দয়া ও ক্ষমাশীল! একজন লজ্জিত অপরাধীকে আপন রহমতের বিস্তৃত দামানে আশ্রয় দিন। ওহে ভাগ্যহতদের ভরসাস্থল! নিজের কৃষ্ণকর্মময় জীবন হতে তাওবা করে আজ আমি আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি। আপনি আপনার উচ্চতা থেকে এক ফরিয়াদির আহ্বান শুনুন। হে ভগ্নমনের ভগ্ন আয়না জোড়া দানকারী! সকল দিক থেকে ফিরে তোমার পথে পা বড়িয়েছি; পৌঁছে দিন কোন মুর্শিদে কামিল, যিনি আমাকে আপনার দ্বার পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। ওহে অমুখাপেক্ষী প্রভু! আমি তোমার দ্বারে ফুটে ফুটে কাঁদবো, অস্থির ছটফট করবো এবং কাতর ফরিয়াদ করবো; যাবৎনা তুমি আমার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।’
রাত নিশীথ। আব্দুল্লাহ তড়িৎ দু‘আ শেষ করে চতুর্দিকে বেদনাবিধুর দৃষ্টিতে দেখে আল্লাহর নাম নিয়ে ঘর হতে বেরিয়ে পড়ল। আল্লাহর অন্বেষণে তার অনন্ত যাত্রার এটি ছিল সূচনাবিন্দু। অলি-গলি অতিক্রম করে সে এক চৌরাস্তায় এসে দাঁড়াল। অজানা ভাবে হৃদয় বলে ওঠল যে, সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওটিই মুর্শিদে কামিলের সাক্ষাতের স্থান। অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে যথেষ্ট সময় বয়ে গেল, তারকারাজির আলো নিভু-নিভু হল। আশা-নিরাশার দোলাচালে কয়েক মুহূর্ত পর অল্প দূরে একটি ছায়া নড়াচড়া করতে দেখা গেল। হঠাৎ হৃদয় আওয়াজ দিল, মুর্শিদে কামিল আসছেন। পদচুম্বনের জন্য আগ্রহী দৃষ্টি ঝুঁকল, ভক্তি-বিশ্বাস পা বাড়াল, আশা-ভরসা স্বাগতম জানাল এবং নিকটে পৌঁছে সে বে-খুদীতে ডাক দিল, “মুর্শিদে কামিল! কতক্ষণ ধরে আমি আপনান অপেক্ষা করছি, আসুন আমার নিকটে আসুন ! আমার হৃদয়রাজ্যে রাজত্ব করুন। আমাকে মুরিদ করুন। আমাকে বিনামূল্যে কিনে নিন, আমি আমার জীবন আপনার হাতে বিক্রয় করছি। আমাকে আপনার বাঁকা যুলফি ও চন্দ্রমুখের দাস বানিয়ে নিন। আমি আমার ললাটশত্র“ স্বাধীনতাকে আপনার কদমে উৎসর্গ করছি”।
আগন্তুক আশ্চর্য হয়ে উত্তর দিল, ভাই! আমি তোমার কথা বুঝতে পারছিনা। তুমি যার অপেক্ষা করছ, আমি সে নয়। আমি আঁধার রাতের ভ্রমণকরী। আমাকে পথ ছেড়ে দাও, তোমার আশা-ভরসার কেন্দ্র অন্য কেউ।
আবদুল্লাহ দামান আঁকড়ে ধরে বল্ল, আমি কার জন্য অপেক্ষা করছি, আমার আশার কেন্দ্র কে, তা জানা আপনার কাজ নয়, আমারই কাজ।
খোদার একজন বিদ্রোহী বান্দাকে খোদার নিকটে পৌঁছে দেওয়া আপনার সত্তার সব চেয়ে বড় দায়িত্ব, মুর্শিদ! বিলম্ব করোনা, আমাকে শীঘ্র মুরীদ করে নেন, যাতে এক মুহূর্ত নষ্ট করা ছাড়া আপনার দিকনির্দেশনায় আমার সফরের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়ে যায়।
আগন্তুক ক্ষণিক গম্ভীর হয়ে বলল, আমার ভইয়া! আমি তোমাকে বলছি যে, তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ। আমি ওই পথের লোক নই। আমার পেশা কি, তুমি জানতে পারলে আমার মুখে থুথু দেবে। সুতরাং ভাল হবে যে, তুমি আমার পথ হতে সরে যাও। যে কাজে আমি আজ ঘর হতে বেরিয়েছি, এখন তার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে; আমার সাথীরা আমার অপেক্ষায় রয়েছে।
সহস্র অনীহ-অস্বীকার সত্ত্বেও আব্দুল্লাহ আপন অবস্থানে অনড় এবং কোন ভাবেই তার দামান হতে পৃথক হতে প্রস্তুত নয়।
আগন্তুকও বিপদে পড়ে গেল। সে এক অপরিচিত পাগলের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ারর কৌশল খুঁজছে, হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বল্ল, “আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যখন মানতেই চাচ্ছনা, আমি তোমাকে মুরীদ করে নিলাম। এখন আজ হতে তুমি আমার হাতে বিক্রিত। যে ভয়ঙ্কর পথে তুমি পা বড়িয়েছ, তা নিরাপত্তার সাথে অতিক্রমের জন্য জরুরি যে, তুমি তোমার মুর্শিদের শর্তহীন আনুগত্য করবে। আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, আমি না ফেরা পর্যন্ত এক কদমও এদিক ওদিক দেবেনা। বিশ্বাস রাখ, ফিরে এসে আমি তোমাকে ওই পথ অতিক্রম করিয়ে দেব, যা আল্লাহর দ্বার পর্যন্ত পৌঁছায়। এখন আমাকে যেতে দাও”।
এ কথা বলে আগন্তুক যে পথে এসেছিল, ওই পথেই ফিরে গেল। যতক্ষণ তাকে দেখা যাচ্ছিল, ততক্ষণ আব্দুল্লাহর দুঃখ ভারাক্রান্ত দৃষ্টি তার পদচুম্বন করতে থাকল।
সকাল হয়ে গেল এবং আব্দুল্লাহ অপেক্ষা করতে ছিল। বেলা গড়িয়ে যাওয়া পর্যন্ত শহরের প্রসিদ্ধ একজন লোক ঘন্টার পর ঘন্টা এক স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা মামুলি বিষয় ছিলনা। চতুর্দিক হতে মানুষের ভিড় জমে গেল। তাঁকে নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য লোকেরা হাজারো বুঝাল, কিন্তু প্রত্যেকের জন্য তার নিকট একটিই উত্তর ছিল,
আমার অস্তিত্বের শাসক আমার মুর্শিদে কামিল আমাকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন যে, যতক্ষণ আমি ফিরে না আসি, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। এখন তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত আমি এখান থেকে সরতে পারবোনা। তিনি ওয়াদাহ দিয়ে গিয়েছেন যে, আমাকে আল্লাহর দ্বার পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন।
লোকেরা বুঝাতে লাগল যে, রাত শেষ হয়েছে, এখন দিনের শেষ প্রহর চলছে, সে আসার হলে এতক্ষণে এসে পড়ত, এখন তার জন্য অপেক্ষা অহেতুক কালক্ষেপণ মাত্র। সে তোমার সাথে মিথ্যা অঙ্গিকার করে গিয়েছে। আব্দুল্লাহ অটল বিশ্বাসের ভঙ্গিতে উত্তর দিল, আপন মুখ পাপমলিন করোনা। মুর্শিদে কামিল কখনো মিথ্যা বলেন না। তিনি অবশ্যই ফিরে আসবেন। বিদায়ের সময় তিনি কোন সময় নির্দিষ্ট করেননি; সতুরাং তাঁর ফেরার সময় ক্বিয়ামত পর্যন্ত। তোমরা আমার পথ হতে সরে যাও, আমি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাঁর অপেক্ষা করবো। দুনিয়ার সবকিছু চলমান ছিল। কত সন্ধ্যা এল গেল, কত সূর্য উদিত হয়ে আবার ডুবে গেল, কিন্তু আব্দুল্লাহ আপন জায়গায় দাঁড়ানো ছিল দাঁড়ানো আছে। এখন সে এলাকার ঘৃণ্য অপরাধী নয় বরং ভক্তি-ভরা দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। সহস্র ভক্ত সর্বদা তাকে আবেষ্টন করে আছে। মুর্শিদে কামিলের অপেক্ষায় এখন সে একা নয়, পাগলের বিরাট একটা দলও সঙ্গে রয়েছে।
পূর্ণিমার রাত, চাঁদ পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। সমস্ত শহর নীরব, সঙ্গের সবাইও তন্দ্রাচ্ছন্ন। পরন্তু আব্দুল্লাহ রীতিমত দাঁড়ানো ছিল এবং তার দু’চোখ অপেক্ষায় খোলা। হঠাৎ সে কোন আগন্তুকের পদধ্বনি অনুভব করল। ফিরে দেখল সফেদ ‘আবায় আবৃত এক বুযুর্গ হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখের মাহত্ম্য, কপালের ঔজ্জ্বল্য এবং চেহরা হতে বর্ষমান নূর বলে দিচ্ছে যে, মানবাকরে আসমানের ফিরিশতা নেমে এসেছেন।
আল্লাহ প্রদত্ত মহত্বের ধমকে আব্দুল্লাহর দৃষ্টি অবনমিত হল। অন্তর এক অজানা প্রভাবে বিভোর হয়ে গেল। আগন্তুক বুযুর্গ অনুযোগপূর্ণ ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে কেন দাঁড়িয়ে রয়েছ? অবনমিত দৃষ্টিতে আব্দুল্লাহ উত্তর দিল, মুর্শিদে কামিলের অপেক্ষায়। আগন্তুক ফের জিজ্ঞাসা করলেন কোন মুর্শিদে কামিল?
আব্দুল্লাহ সাহস করে উত্তর দিলেন, ওই মুর্শিদে কামিল, যার হাতে আমি মুরীদ হয়েছি। তিনি আমার সাথে অঙ্গিকার করেছেন, তুমি এখানে অপেক্ষা কর, আমি ফিরে এসে তোমাকে আল্লাহর দ্বারে পৌঁছে দিব।
নবাগন্তুক বুঝাবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘প্রিয়! সে মুর্শিদে কামিল নয়, আঁধার রাতের পথিক, আল্লাহর দরবারের রাস্তা স্বয়ং তার অজানা, সে তোমার পথপ্রদর্শন কি করবে? এখন সে আর ফিরে আসবেনা, অহেতুক তার অপেক্ষায় নিজের প্রাণ ধ্বংস করোনা’।
আব্দুল্লাহ তাগিদ দিয়ে বল্লেন, আমার হৃদয়ের বিশ্বাস কোন ভাবেই প্রকম্পিত হতে পারেনা যে, তিনি অবশ্যই আসবেন এবং আল্লাহর দরবারের পথ তার জানা আছেই। মুর্শিদে কামিল কখনো মিথ্যা বলতে পারেননা।
নবাগন্তুক বুযুর্গ সতর্ক করার ভঙ্গিতে বললেন, একটি ভুল বিষয়ে জেদ করোনা। মারাত্মক প্রতারণার শিকার হয়েছ তুমি। নিজের অজ্ঞতায় এক চোরকে মুর্শিদে কামিল মনে করে বসেছ। ঘুমন্ত মানুষের চোখের কাজল চোরও যদি মুর্শিদে কামিল হতে পারে, তবে দুর্ভাগা দুনিয়ার এ রূপ মুর্শিদে কামিলের কোন প্রয়োজন নেই। আফ্সোস তোমার নির্বুদ্ধিতার ওপর!
এখন আব্দুল্লাহর ধৈর্যের নিক্তি টলছে, মুর্শিদে কামিলের বিরুদ্ধে কথার এ তীর সহ্য হলনা, সে ফুঁসে-ফুঁসে কাঁদছে। কোন মতে কান্না সংবরণ করে ব্যথা-বেদনার অনলে জ্বলে ওঠে বল্ল, কঠিন আফসোস যে, এক দিকেতো আপনার আপাদমস্তক হৃদয়ে ফিরিশতা জগতের প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিল আর অন্য দিকে মুর্শিদে কামিলের তিরস্কার করছেন! এত পবিত্র হয়ে আপনার এ রীতি বুঝে আসছেনা। বেয়াদবী মনে না করলে হলে আপনার পবিত্র নাম জানার মর্যাদা অর্জন করতে পারি?
নবাগন্তুক বুযুর্গ সাহাস্যে বললেন, আমার নাম শুনে যদি তোমার কোন উপকার হয় তবে শুন যে, আমাকে ‘খিদ্বর’ বলা হয়। পথভুলা মুসাফিরকে সঠিক রাস্তায় ফিরিয়ে আনা আমার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব; এ সূত্রেই আমি তোমাকে বুঝিয়েছি। নাম শুনেই আব্দুল্লাহ পদচুম্বন করল। ‘আবার দামান চোখে লাগাল এবং আদবের প্রাবল্যে কাঁপতে-কাঁপতে বল্ল, আজ আমি নিজের সৌভাগ্যের ওপর যতই আনন্দ করি কম হবে যে, কোন মিনতি-ফরিয়াদের কষ্ট ছাড়া ওই জীবন সঞ্চারক ঝলকে আমার আঁখি তৃপ্ত হচেছ! সে সাথে এ আবেদনের অনুমতি দিন যে, যে মুর্শিদে কামিলকে চোর বলা হচ্ছে, তার হাতে মুরীদ হওয়ার পরই আমার এ সৌভাগ্য লাভ হয়েছে। ওই “চোর” এর সম্পর্কের এ সম্মান কি আমার জন্য গর্বযোগ্য নয়? সৌভাগ্য যে, আপনার আগমনে মুর্শিদে কামিলের ওপর আমার বিশ্বাস আরো দৃঢ় হল।
হযরত খিদ্বর স্নেহমাখা সুরে বললেন, ফের তুমি ভুলের দ্বিরুক্তি করলে, আমি মুর্শিদে কামিলকে চোর বানাচ্ছিনা; তুমি এক চোরকে মুর্শিদে কামিল বানিয়ে নিয়েছ। অবশ্যই আল্লাহর মর্জির এমন নিদর্শন অনুমিত হচ্ছে যে, শেষতক তোমার জেদে “চোর” কেই মুর্শিদে কামিল বানিয়ে দেওয়া হবে। প্রকৃত অন্বেষীর এ পাগলামি ও অনুরাগ-আকর্ষণের এ উদ্যম শয়তানের প্রতারণা হতে সংরক্ষিত থাকলে তবে সুসংবাদ শুনে নাও যে, এ স্থানে মুর্শিদে কামিলের সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে। সাক্ষাতের কয়েক মুহূর্ত পর তুমি আল্লাহর মহান দরবারে ইরফান বা খোদা পরিচয়ের নিরিবিলিতে সৌভাগ্য মণ্ডিত হবে। ওই প্রাণদীপ্ত ক্ষণের অপেক্ষায় থাক, যখন তোমার হৃদয়ের ভূমিতে আল্লাহর তজল্লীর আর্শ বিছানো হবে। সর্বশক্তিমান প্রভু তোমার উম্মাদ-উদ্যম সংরক্ষণ করুন। এ বলে হযরত খিদ্বর ফিরে গেলেন এবং দু’কদম  চলে আদৃশ্য হয়ে গেলেন। অল্পক্ষণ পর সকালের শুভ্রতা পরিস্ফুটিত হল এবং রাতের আঁধার বিদূরিত হতে লাগল। আজ বহুদিন পর আব্দুল্লাহর ক্ষণিকটা নিদ্রা এল। চোখ লেগে আসতেই সে দেখল যে, ভাগ্য-কারিকর আল্লাহর আর্শের ছায়ায় দাঁড়ানো, হঠাৎ আল্লাহর মহানত্বের পর্দা হতে একটি আওয়াজ বেরুল; অমনি আল্লাহর মহানত্বের ভয়ে উর্ধ্ব জগতের ফিরিশ্তা সিজদায় পতিত হল।
আঁধার রাতের ডাকু অথবা আব্দুল্লাহর মুর্শিদে কামিল ইহইয়ার মনে আজ আনন্দ ধরেনা। মনোরম নগরী বাগদাদ সম্পর্কে সে বহু কথা শুনতে পেয়েছে। বহুদিনের আশা যে, একবার এ ধনী শহরে গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষার। আজ কতেক সাহসী সাথীর সাহায্যে বাগদাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচীর সিদ্ধান্ত হল।
পরামর্শ মতে অতি প্রত্যুষে বাগদাদ যাত্রার সিদ্ধান্ত ছিল বলেই রাতেই সবাই এক স্থানে একত্রিত হয়েছিল। আলো ফুটতেই আঁধার রাতের চোরের দল বাগদাদ অভিমুখে যাত্রা দিল।
বাগদাদ যত নিকটবর্তী হচ্ছিল, অজ্ঞাতভাবে ইহইয়ার প্রাণস্পন্দন ততই বেড়ে যাচ্ছিল। নিজের এ অস্থিরতার কথা সাথীদের বার কয়েক বল্লেই কেউ সেদিকে বিশেষ কর্ণপাত করলনা।
দিবা-রাত্র কয়েকদিন চলার পর বাদগাদ কেবল এক মনযিলের দূরত্বে রইল। সন্ধ্যা নেমে এল। এক উপত্যকা ডিঙ্গিয়ে তারা পর্বত চূড়ায় ওঠল। সামনেই বাগদাদের সুন্দর শহর ঝিকমিক করছে। অভীষ্টে দৃষ্টি পড়তেই হৃদয় হর্ষিত এবং প্রাণ নেচে ওঠল। অল্পক্ষণ পর ওই দস্যু-দল বাগদাদে প্রবেশ করল। একটি বিস্তৃত ময়দান অতিক্রম কালে এক সুরম্য অট্টালিকা দেখা গেল। দরজায় বাহনের ভিড়, ঘোড়ার সারি, উটের পাল দেখে ইহইয়া (আব্দুল্লাহর মুর্শিদে কামিল) হাঁটতে-হাঁটতে দাঁড়িয়ে গেল। তার অনুমান ভুল ছিলনা যে, এটি শহরের সর্বাপেক্ষা বড় সরদারের ঘর। পাশে দাঁড়িয়েই এক পথচারীকে জিজ্ঞাসা করল, এটি কি শহরের কোন বড় সরদারের ঘর? উত্তর পেল যে, শুধু শহরের নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের সব চেয়ে বড় সরদারের ঘর। আজ পর্যন্ত তাঁর ধনভাণ্ডারের শেষ কেউ নাগাল পায়নি। তাঁর কদমের নীচে সোনাÑচাঁদির খনি বিস্তৃত। সপ্ত মহাদেশের রাজত্ব তাঁর ঘরের এক সাধারণ দাসীরও হস্তাগত। বায়ুমণ্ডল, সাগর-মহাসাগর, পাহাড় ও তেপান্তর সর্বত্র তাঁর কর্তৃত্ব-মহাত্মের ঝাণ্ডা ওড়ছে। পথচারীর কথা শুনে তার দেমাগ এক অজ্ঞাত ভীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আশ্চর্যান্বিতার প্রাবল্যে তার চক্ষু স্থির হয়ে রইল। বড় কষ্টে জিজ্ঞাসা করল, ওই সরদারের নাম কি?
পথচারী বল্ল, এক নাম হলেতো বলা যায়, অসংখ্য নাম কি বলবো! দস্তগীরে কাওনাইন বা উভয় জগতের সাহায্যকারী, মখদুমুল ওয়ারা, শায়খুস্ সাকলাইন, খাজায়ে কায়েনাত, কুতবুল আকতাব, গাউসুল আ’যম, ইমাম জীলানী, মাহবূবে সুবহানী; এ ধরনের নামাবলীর এক সোনালী ধারা তাঁর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট। পথচারী দ্রুত উত্তর দিল এবং মুহূর্ত কাল অপেক্ষা না করেই আগে চলল।
ইহইয়া বিজয়ীর ঢঙে সাথীদের বল্ল, মনে হয় আজ ভাগ্যের সেতারা উর্ধ্ব-কক্ষপথে রয়েছে; এত বড় ধনীর গৃহের ধূলি-বালি হস্তাগত হলেও সারা জীবনের জন্য যথেষ্ট। অর্ধরাত পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনার পর সমূহ প্রস্তুতি সম্পন্ন হল। ইহইয়া অত্যন্ত চতুরতায় সকলের দায়িত্ব বন্টন করে দিল। আজ কেন জানি গাউসুল ওয়ারা (রা.)’র খানকাহের পেছনের দরজা খোলা ছিল। রাত যথেষ্ট গভীর; সারা বাগদাদ নীরব নিদ্রায় নিমগ্ন ছিল। কোথাও কোথাও নৈশ-প্রহরীর শব্দ শুনা যাচ্ছে।
ইহইয়া সন্তর্পণে পিছনের দেওয়ালের দিকে এগোল এবং দরজা খোলা দেখে তার চোখ খুশিতে চমকে ওঠল। অন্তরের দ্রুত-স্পন্দন নিয়ে হিম্মত করে ভিতরে প্রবেশ করল। আঁধারে বহুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরল, কিন্তু কিছুই পেলনা। বিষম আশ্চর্য হল যে, এত বড় সরদারের ঘর আর সম্পূর্ণই খালি! অকৃতকার্যতার অনুশোচনা নিয়ে ফেরার সময় ভাবল যে, কেন এ ঘরের ধূলি-বালি নিচ্ছিনা, হতে পারে তাতে সোনা-চাঁদির চূর্ণ লুকিয়ে আছে।
চতুর্দিক হতে ধূলি-বালি কুড়িয়ে ছোট্ট গাঁটরি বেঁধে বাইরে পা রাখতেই হঠাৎ আঁখি তলে আঁধার ছেয়ে গেল। কয়েকবার পলকপাতের পর অনুভব করল যে, চক্ষুজ্যোতি বিদূরীত হয়েছে। ভীত হয়ে বসে পড়ল। কলিজা কেঁপে ওঠল। আগ বাড়ার হিম্মত রইলনা। অমনি নিকট থেকেই প্রহরীর শব্দ কানে এল। ভীত সন্ত্রস্ত ফের ঘরের ভিতর ফিরে এসে এক কোণায় লুকিয়ে বসে গেল। দু’ জগতের সাহায্যকারী গাউসুস্ সাকলাইন (রা.) তাহাজ্জুদের নামায সমাপন করে অবসর হলেন। শশীমুখ হতে নূরের কিরণ বিচ্ছুরিত হচ্ছে। কপালের তরঙ্গে অনুগ্রহ ঢেউ খেলছে। কাজলমাখা আঁখি হতে জ্যোতির নির্ঝর উৎলে ওঠছে। হৃদয়ের আলোকদীপ্ত প্রদীপ বেলায়ত রাজ্যের চিত্রগৃহকে চমকিত করছে।
সম্মুখে অদৃশ্যের  সিংহ পুরুষরা হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। একজন প্রতিনিধি এগিয়ে এসে বললেন, মহারাজ! অমুখ শহরের এক আবদাল ইন্তিকাল করেছেন। সত্যবাক মুখে দয়ানুগ্রহের দু‘আ করতঃ গাউসুল ওয়ারা (রা.) সম্মুখে এগোলেন। হঠাৎ কারো পদধ্বনি শুনে ইহইয়া কেঁপে ওঠল এবং পলাতে ইচ্ছা করে পরিণতি চিন্তায় আবার বসে পড়ল।
“আজ আমার ঘরে কোন অতিথি আছে” হৃদয়রাজও জয়করা ধ্বনি কানে এল। আশা-নিরাশার দোলাচালে চুপ থাকার পর আত্মসমর্পণকারী অপরাধীর ন্যায় তার মুখ থেকে বেরুল, “মহারাজ! আমি এক দুর্ভাগা! আঁধার রাতের ডাকু; আল্লাহ প্রদত্ত ধনরাজির প্রসিদ্ধি শুনে এখানে এসেছি। অধিকন্তু সমস্যার বেড়াজালে আটকে পড়েছি। এখন জীবনের সবচেয়ে বড় মাতম যে, এখানে এসে নিজের চক্ষুজ্যোতি হারিয়ে বসেছি। আহা! জগতের বড় সরদারের ঘরে কতইনা আশা নিয়ে এসেছিলাম; এখন না জানি অদৃষ্টে কি আছে!” এতটুকু বলতে বলতে তার কন্ঠে শব্দ আটকে গেল এবং সে ফুঁসে-ফুঁসে কাঁদতে লাগল।
কেঁদোনা! অনুগ্রহের দর্পণ বড়ই কোমল হয়ে থাকে; সামন্য আঘাতে ঘায়েল হয়ে যায়। আমার দামানে চোখ মুছে নাও। এটা নিরাশ বঞ্চিতদের আশ্রয়স্থল। এখানে অপরাধীকে শাস্তি নয়, হৃদয় পবিত্র করা হয়। আমার দ্বারের আশাবাদী আজতক শূন্য হাতে ফিরেনি। ধৈর্য ধারণ কর। চক্ষুজ্যোতি লাভসহ প্রত্যাবর্তিত হবে। এটা বলতে বলতে গাউসুল ওয়ারা (রা.) পুরোপুরি তার কাছে এসে গেলেন। দ্বিতীয় মুহূর্তে দয়ার কার্যকারক দৃষ্টি ওঠল এবং তার জ্যোতিহীন চক্ষুপথে হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছল। বেশ! মুহূর্তেই খোদা পরিচয়ের সমস্ত সূক্ষ্মতত্ত্ব উদ্ভাসিত হয়ে গেল এবং পলক পড়তেই সে আলমে লাহূতের শেষ সীমানায় দাঁড়ানো। এখন সে আঁধার রাতের ডাকু নয়, বেলায়ত রাজ্যের মুকুটধারী।
গাউসুল ওয়ারা (রা.)’র পক্ষ থেকে নির্দেশ জারী হল, এখনই খবর এল যে, অমুক শহরের আবদালের ইন্তিকাল হয়েছে। আজ থেকে ওই স্থানে তোমাকে বহাল করা হচ্ছে। তড়িৎ গিয়ে আপন পদবীর দায়িত্ব সামলাও। এক অথৈ প্রেমাবেগে ঝুঁকে সে শাহানশাহে বাগদাদ (রা.)’র পদচুম্বন করল এবং উল্টা কদমে ফিরে গেল।
দরজায় পৌঁছে বাইরে কদম ফেলতেই অদৃশ্যের সিংহ পুরুষদের সমাবেশ হতে আওয়াজ এল, “শেষতক এক পাগলের উদ্যম চোরকে ‘মুর্শিদে কামিল’ বানিয়ে ছাড়ল”। ফের ওই সড়ক দিয়ে আজ সে চলছে, যে পথে চলে সে হাকীকতের পরিচিতির মহাসমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছেছিল। পরন্তু পায়ের নীচে মাটি নয়, জগৎবাসীর হৃদয় বিছানো রয়েছে। কয়েক কদম যাওয়ার পর শহরের দালান দেখা যাচ্ছিল; জনবসতির এক চৌরাস্তায় সহস্র লোকের ভিড় দৃশ্যমান। এক ভিনদেশী পথচারী মনে করে লোকেরা তাকে পথ দেখিয়ে বল্ল, ভিড়ের কারণে এ দিকের আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে; আপনি অন্য কোন পথ ধরে যান। ইহইয়া জিজ্ঞাসা করল, এখানে এটা কিসের ভিড় যে, পথচারীর আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে?
লোকেরা আশ্চর্যান্বিত-সুরে বল্ল, “কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল, এ ঘটনা ‘টক অব দ্যা টাউন’ আর আপনার খবরই নেই! কতই আশ্চর্য!”
ইহইয়া বল্ল, আমি এ শহরের বাসিন্দা নই। আমাকে প্রকৃত ঘটনা খুলে বলুন। লোকেরা বল্ল, আমাদের শহরের এক সুস্থ-সবল ব্যক্তি কয়েক সপ্তাহ ধরে পাগল হয়ে গিয়েছে। এ চৌরাস্তায় দিন-রাত দাঁড়িয়ে থাকে। সে বলে যে, আমি মুর্শিদে কামিলের অপেক্ষায় এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি আমার সাথে ওয়াদা করে গিয়েছেন যে, তুমি এখানে আমার জন্য অপেক্ষা কর; আমি ফিরে আসার পর তোমাকে আল্লাহর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিব। তাকে হাজারো বুঝানো হয়েছে যে, সে আর ফিরে আসবেনা। সকলকে এ উত্তরই দেয় যে, মুর্শিদে কামিল মিথ্যা বলতে পারেননা; কখনো না কখনো তিনি অবশ্যই আসবেন। হৃদয়ের আকর্ষণ তার প্রতি এতই বেড়ে গিয়েছে যে, এখন সে একা নয়, তার চতুর্পাশে পতঙ্গের মেলা লেগে থাকে। লোকদের কথায় হঠাৎ তার স্মৃতি সতেজ হল এবং সে রাতের সমস্ত ঘটনা দৃষ্টির সামনে ভেসে ওঠল। ভালভাবে দেখতেই মনে পড়ল, এ চৌরাস্তাতেই এক পাগলের সাথে তার দেখা হয়েছিল, সে তাকে হাত ধরে মুরিদ করিয়েছিল এবং ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষার নির্দেশ দিয়েছিল। এ সমস্ত ঘটনা মনে পড়তেই সে আত্মহারা হয়ে গেল। ভাবাবেগ সামলাতে পারলনা। প্রবল অনুরাগে জামা ছিঁড়তে-ছিঁড়তে শোরগোল করতে করতে মাজমার  দিকে দৌঁড়ে গেল এবং ভিড় ফাঁক করে অব্দুল্লাহর নিকট পৌঁছে আওয়াজ দিল, ‘আমি এসে পড়েছি, আমি এসেছি, হে আমার মুরিদ! আমি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে এসেছি’। চেনা-জানা শব্দ শুনে আব্দুল্লাহ হতচকিত হল। চেহরায় দৃষ্টি পড়তে স্বতঃস্ফূর্ত চিৎকার দিল।
মুর্শিদে কামিল এসে গিয়েছেন! মুর্শিদে কামিল এসেছেন! আমি বলে ছিলাম, মুর্শিদে কামিল মিথ্যা বলেননা, তিনি অবশ্যই আসবেন। এ কথা বলতে বলতে ব্যাকুল হয়ে মুর্শিদে কামিলের বুকে জড়িয়ে গেল। বহু দিনের পিপাসাকাতর একটি প্রাণ খোদাপরিচয়ের নির্ঝর হতে তৃষ্ণা মিটাচ্ছিল আর তজল্লীর এক নূতন জগত দৃষ্টির সামনে চমকাতে ছিল। আলিঙ্গনাবদ্ধ কয়েক মুহূর্ত কেটে যেতেই মুর্শিদে কামিল আওয়াজ দিল,
আব্দুল্লাহ! চক্ষু মেলো! তুমি আল্লাহর চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছ। চোখ খুলতেই আব্দুল্লাহ সিজদায় লুটে পড়ল। দৈববাণী এল, ‘শেষ পর্যন্ত এক পাপী বান্দা প্রেমের আহাজারি ও ফরিয়াদের মনোদাহ আর তাপে আপন রুষ্ট মাওলাকে সন্তুষ্ট করেই নিয়েছে’।
‘তপন কিরণ স্বয়ং অস্থির প্রেমের আকর্ষণে;
নইলে হাকীকত সবই জানা অণুর উড্ডয়নের’।