ইয়া মুহাম্মাদু আহবান?
✍️বোরহান উদ্দিন মুহাম্মদ শফিউল বশর
[ধারাবাহিক]
[যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নাম ধরে ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ আহবান শিষ্টাচার বহির্ভূত মনে করেন না, তাঁরা আপন সংজ্ঞায়িত আজব শিষ্টাচারমূলে মা-বাবা, উস্তাদ, পীর- মুরশিদকে নাম ধরে ডাকার রীতি চালু করেন ঝটপট]
আমাদের দেশে এমন একটা ছেলেও হয়তো পাওয়া যাবে না, যেই নিজের মা-বাবাকে নাম ধরে ডাকে। এমন একজন ছাত্রও পাওয়া যাবে না, যেই নিজের শিক্ষককে নাম ধরে ডাকে। এমন কোন শিষ্য পাওয়া যাবে না, যেই আপন গুরুকে নাম ধরে ডাকে। মা-বাবা, শিক্ষক, পীর- মুর্শিদকে কেন নাম ধরে ডাকা হয় না? নিশ্চয় এটাকে সবাই বেয়াদবি মনে করেন, তাই। গুরুজনদের নাম ধরে ডাকা যদি সম্মানহানিকর আর বেয়াদবি মনে করা হয়, তবে জগতগুরু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লামাকে নাম ধরে ডাকা কোন যুক্তিতে আদব বিবেচিত হবে?
কোন ছেলে মা-বাবাকে, ছাত্র শিক্ষককে, মুরিদ পীরকে যদি নাম ধরে ডাকে, তবে আমাদের সমাজে তাকে বেয়াদব মর্মে সীল মেরে দেওয়া হয়। এবার নিজেদের অন্তরকে একবার জিজ্ঞাসা করুন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লামাকে নাম ধরে ডেকে আপনারা কী করে বা-আদব থাকবেন? হুম, সীল আপনাদের দখলে, তা-ই? মনে রাখবেন, আপনাদের সীলের কালি একদিন মুছে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহ মোহর মেরে দিলে তা আর মুছার নয়।
ক্বুরআনে কারীমে দৃষ্টি দিলেই দেখা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে যখনই আহ্বান- সম্বোধন করেছেন, উপাধি যোগেই করেছেন; নাম যোগে করেননি। আল্লাহ তা‘আলা মু‘মিনদের এই দীক্ষাই দিয়েছেন যে, তোমরা আমার হাবীবকে নাম ধরে আহ্বান- সম্বোধন করোনা।
তাশাহ্হুদস্থ সালামী, মি’রাজের অন্যতম বিশেষ উপহার। সেখানেও খিত্বাব বা সম্বোধন নাম যোগে নয়, উপাধি যোগে ‘ওহে নবী’ রয়েছে। ইরশাদ: ‘আস্সালামু আলাইকা আয়্যুহান্নবীয়্যু’।
অবশ্য প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কিরামের অনেকেই নাম যোগে আহ্বান- সম্বোধন করতেন। আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার সম্মানার্থে তা নিষেধ করে দেন। ইমাম হাফিয জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান বিন আবূ বকর আস্সুয়ূতী সূরাতুন্নূরের ৬৩ নাম্বার আয়াতের শানে নুযূলে লিখেছেন,
أخرج أبو نعيم في الدلائل من طريق الضحاك عن ابن عباس قال: كانوا يقولون: يا محمد يا أبا القاسم فأنزل الله: (لا تجعلوا دعاء الرسول بينكم كدعاء بعضكم بعضا) فقالوا: يا نبي الله يا رسول الله.
আবূ নু’আয়ম দালায়িলে দ্বাহ্হাকের সূত্রে ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তাঁরা ‘ইয়া মুহাম্মদু’ ‘ইয়া আবাল ক্বাসিম’ বলতেন, অতএব আল্লাহ তা‘আলা ‘তোমাদের পরস্পরে একে অপরকে যেমন আহ্বান করো, রাসূলের আহ্বানকে তেমন স্থির করোনা’ অবতীর্ণ করেন; সুতরাং তাঁরা ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলতেন। [সূত্র: লুবাবুন নুক্বূল ফী আসবাবিন নুযূল, ১৪৬ পৃষ্ঠা, দারু ইবনিল হায়সাম- আলক্বাহিরা]।
এই বর্ণনা মতে সুস্পষ্ট যে, আলোচিত আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাকে নাম-উপনামে ডাকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার আগে নাম উপনামেও কেউ কেউ ডাকতেন।
দরবারে মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লামার আদব এমন এক সূক্ষ্মতর বিষয়, যেখানে কিঞ্চিৎ হেরফের হলেই অজান্তেই সমুদয় আমল উৎসন্নে যেতে পারে। ইরশাদ হচ্ছে,
أَن تَحبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
‘এতে তোমাদের কর্ম নিস্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না’ (সূরাহ হুজরাত ২ নাম্বার আয়াত সংক্ষেপিত)।
উল্লিখিত বিবেচনাবোধ টুকু যাদের আছে, তাদের জন্য দলীল-প্রমাণ নিষ্প্রয়োজন। যারা সেই বিবেচনাবোধ টুকুও হারিয়ে তর্কের পথ বেছে নিয়েছেন, তাঁদের জন্য সপ্রমাণ আলোচনা নিম্নে প্রদত্ত হল।
প্রথম:
ইমাম জালালুদ্দীন আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন শিহাবুদ্দীন আহমদ আব্বাসী আনসারী মুহাল্লী ক্বাহিরী শাফি’য়ী ( ৭৯১- ৮৬৪ হিজরী) লিখেছেন,
[لاتجعلوا دعاء الرسول بينكم كدعاء بعضكم بعضا ] بأن تقولوا يا محمد بل قولوا يا نبي الله يا رسول الله في لين وتواضع وخفض صوت –
“রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের পরস্পরের মাঝে তোমাদের একে অপরকে ডাকার মতো স্থির করোনা’ যে, ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ বলবে; বরং মৃদু স্বরে বিনয়-বিনম্রতায় ‘ইয়া নাবীয়্যাল্লাহ’ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলো”। [তাফসীরু জালালাইন ৩০২ পৃষ্ঠা, আলমাকতাবাতুল আশরাফীয়্যাহ, দেওবন্দ-হিন্দ]।
দ্বিতীয়:
قوله: {لاَّ تَجْعَلُواْ دُعَآءَ ٱلرَّسُولِ بَيْنَكُمْ} أي نداءه بمعنى لا تنادوه باسمه فتقولوا: يا محمد، ولا بكنيته فتقولوا: يا أبا القاسم، بل نادوه وخاطبوه بالتعظيم والتكريم والتوقير بأن تقولوا: يا رسول الله، يا إمام المسلمين، يا رسول رب العالمين، يا خاتم النبيين، وغير ذلك، واستفيد من الآية أنه لا يجوز نداء النبي بغير ما يفيد التعظيم، لا في حياته ولا بعد وفاته، فبهذا يعلم أن من استخف بجنابه صلى الله عليه وسلم فهو كافر ملعون في الدنياوالآخرة-
“তাঁর (আল্লাহর) বাণী ‘ তোমাদের পরস্পরের মাঝে রাসূলের আহ্বান তথা ডাকাকে তেমন স্থির করোনা’ অর্থাৎ তাঁকে নাম যোগে ডেকো না যে, ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ বলবে, না উপনাম যোগে ‘ইয়া আবাল ক্বাসিম’ বলবে, বরং সম্মান-মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সাথে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ ‘ইয়া ইমামাল মুসলিমীন’ ‘ইয়া রাসূলা রাব্বিল আলামীন’ ‘ইয়া খাতামান নবীয়্যিন’ ও অন্যান্য উপাধিমূলক উক্তিতে তাঁকে আহ্বান-সম্বোধন করো। আয়াত থেকে অবহিত হওয়া যায় যে, সম্মানাত্মক ব্যতীত অন্য শব্দে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাকে আহ্বান করা জায়েয নয়; না তাঁর ইহলৌকিক জীবনে, না প্রয়াণোত্তরে। এতদ্বারা জানা যায় যে, যেই ব্যক্তি তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার সম্মানের অবজ্ঞা করবে, সেই দুনিয়া ও আখিরাতে কাফির- অভিশপ্ত”। [সূত্র:হাশিয়াতুস সাভী আলা তাফসীরিল জালালাইন, শায়খ আহমদ বিন মুহাম্মদ সাভী, মিসরী, খালাওয়াতী, মালেকী, (১১৭৫-১২৪১ হিজরী), ৯৫ পৃষ্ঠা, তৃতীয় খণ্ড, দারুল হাদীস আলক্বাহিরা]।
তৃতীয়:
قال الضحاك ، عن ابن عباس : كانوا يقولون : يا محمد ، يا أبا القاسم ، فنهاهم الله عز وجل ، عن ذلك ، إعظاما لنبيه ، صلوات الله وسلامه عليه قال : فقالوا : يا رسول الله ، يا نبي الله . وهكذا قال مجاهد ، وسعيد بن جبير .
وقال قتادة : أمر الله أن يهاب نبيه صلى الله عليه وسلم ، وأن يبجل وأن يعظم وأن يسود .
وقال مقاتل [ بن حيان ] في قوله : ( لا تجعلوا دعاء الرسول بينكم كدعاء بعضكم بعضا ) يقول : لا تسموه إذا دعوتموه : يا محمد ، ولا تقولوا : يا بن عبد الله ، ولكن شرفوه فقولوا : يا نبي الله ، يا رسول الله .
وقال مالك ، عن زيد بن أسلم في قوله : ( لا تجعلوا دعاء الرسول بينكم كدعاء بعضكم بعضا ) قال : أمرهم الله أن يشرفوه، هذا قول . وهو الظاهر من السياق-
“দ্বাহ্হাক ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তাঁরা (সাহাবায়ে কিরাম) ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ ‘ইয়া আবাল ক্বাসিম’ বলতেন, অতএব আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লা তাঁর নবী সালাওয়াতুল্লাহি ওয়া সালামুহু আলাইহি’র সম্মানার্থে তা থেকে তাঁদের নিষেধ করেন। সুতরাং তাঁরা ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ বলেন।
মুজাহিদ এবং সাঈদ বিন জুবাইরও অনুরূপ বলেছেন।
এবং ক্বাতাদাহ বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাকে অধিক মান-মর্যাদা, শ্রদ্ধা-সম্মান ও মাহাত্ম্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এবং মুক্বাতিল (ইবনে হায়্যান) ‘রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের পরস্পরের মাঝে একে অপরের আহ্বানের ন্যায় স্থির করোনা’ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তাঁকে যখন ডাকবে, ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ নাম নিয়ে আহ্বান করোনা এবং না ‘ইয়া ইবনা আব্দিল্লাহ’ বলবে; বরং তাঁকে সম্মান দিয়ে ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলবে।
এবং মালিক যায়েদ বিন আসলাম থেকে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাঁদের নির্দেশ দিয়েছেন তাঁকে সম্মান দিতে’। এটিই সারকথা এবং আয়াতের ধারাভাষ্যেও তা সুস্পষ্ট।” [সূত্র: মুখতাসারু তাফসীরি ইবনি কাসীর, হাফিয ইমাদুদ্দীন আবূল ফিদা ইসমাঈল বিন কাসীর দামেশক্বী (ইন্তিক্বাল: ৭৭৪ হিজরী), দ্বিতীয় খণ্ড, ৫৯০ পৃষ্ঠা, আলমাকতাবাতুত্ তাওফীক্বীয়্যাহ]।
চতুর্থ:
وقيل : المعنى لا تجعلوا نداءه عليه الصلاة والسلام وتسميته كنداء بعضكم بعضاً باسمه ورفع الصوت به والنداء وراء الحجرات ولكن بلقبه المعظم مثل يا نبي الله ويا رسول الله مع التوقير والتواضع وخفض الصوت .
أخرج ابن أبي حاتم . وابن مردويه . وأبو نعيم في الدلائل عن ابن عباس قال : كانوا يقولون : يا محمد يا أبا القاسم فنهاهم الله تعالى عن ذلك بقوله سبحانه : { لاَّ تَجْعَلُواْ } الآية إعظاماً لنبيه صلى الله عليه وسلم فقالوا : يا نبي الله يا رسول الله ،
وروي نحو هذا عن قتادة . الحسن . وسعيد بن جبير . ومجاهد ،
وفي أحكام القرآن للسيوطي أن في هذا النهي تحريم ندائه صلى الله عليه وسلم باسمه .
والظاهر استمرار ذلك بعد وفاته إلى الآن
এবং বলা হয়েছে যে, তাঁর আহ্বান ও আখ্যায়নকে তোমাদের একে অপরকে নাম ধরে উচ্চস্বরে প্রাচীরের আড়াল থেকে ডাকাডাকির মতো গণ্য করোনা; বরং মৃদু স্বরে সবিনয়ে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ ও ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’র মতো মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে আহ্বান করো।
ইবনু আবী হাতিম, ইবনু মারদুভীয়্যাহ, আবূ নু‘আয়ম দালায়িলে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তাঁরা (সাহাবায়ে কিরাম) ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ ‘ইয়া আবাল ক্বাসিম’ বলতেন; অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার সম্মানার্থে আপন উক্তি “লা তাজ‘আলূ” আয়াত দ্বারা তা থেকে তাঁদের বারণ করেন। অতএব তাঁরা ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলেন।
অনুরূপ বর্ণনা ক্বাতাদাহ, হাসান, সাঈদ বিন জুবায়ের ও মুজাহিদ থেকেও বর্ণিত।
সুয়ূতীর আহকামুল ক্বুরআনে রয়েছে, নিশ্চয় এ নিষেধে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাকে নাম ধরে ডাকা হারাম সাব্যস্ত।
এবং সুস্পষ্ট যে, ওই নিষেধাজ্ঞার স্থায়িত্ব তাঁর বিসালের পর অদ্যাবধি। [সূত্র: রূহুল মা’আনী ফী তাফসীরিল ক্বুরআনিল আযীমি ওয়াস্সাব’য়িল মাসানীয়্যি, আবূস্ সানা শিহাবুদ্দীন সায়্যিদ মাহমূদ আলূসী বাগদাদী ( ইন্তিক্বাল ১২৭০ হিজরী), দশম খণ্ড, ৩০৫ পৃষ্ঠা, আলমাকতাবাতুত্ তাওফীক্বীয়্যাহ]।
উক্ত ব্যাখ্যায় মনোনিবেশ করলে অনেক দ্বন্ধ দূর হয়ে যাবে। যারা হাদীসের বর্ণনায় ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ সম্বোধন নিয়ে ভাবেন, তাদের অনেক গুলোই নিষেধাজ্ঞা পূর্বের। যারা নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ নিয়ে দ্বিধান্বিত, তাদের দ্বিধাও দূর করে দিয়েছেন তিনি।
পঞ্চম:
أو لا تجعلوا تسميته ونداءه بينكم كما يسمى بعضكم بعضا ويناديه باسمه الذي سماه به أبواه، ولا تقولوا يا محمد ولكن يا نبي الله ويا رسول الله مع التوقير والتعظيم والصوت المخفوض والتواضع.
অথবা তাঁর আখ্যায়ন ও আহ্বানকে তোমাদের মাঝে তোমরা একে অন্যে যেভাবে আখ্যায়ন এবং বাবা-মায়ের দেওয়া নামে ডাকো, তেমন স্থির করোনা। এবং ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ বলোনা, বরং বিনয়ের সাথে অনুচ্চ স্বরে পরিপূর্ণ ভক্তি- শ্রদ্ধায় ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলো। [সূত্র:আকাশ্শাফু আন হাক্বায়িকিত তানযীল ওয়া উয়ূনিল আক্বাবীল ফী ওজূহিত্তাবীল, আবুল ক্বাসিম জারুল্লাহ মাহমূদ বিন উমর যামাখশারী- খাওয়ারেযেমী, তৃতীয় খণ্ড,২২৭ পৃষ্ঠা, মাকতাবাতু মিসর]।
ষষ্ঠ:
وقيل لا تجعلوا نداءه وتسميته كنداء بعضكم بعضاً باسمه ورفع الصوت به والنداء من وراء الحجرات، ولكن بلقبه المعظم مثل يا نبي الله، ويا رسول الله مع التوقير والتواضع وخفض الصوت،
এবং বলা হয়েছে যে, তাঁর আহ্বান ও আখ্যায়নকে তোমাদের একে অপরকে নাম ধরে উচ্চস্বরে প্রাচীরের আড়াল থেকে ডাকাডাকির মতো গণ্য করোনা; বরং মৃদু স্বরে সবিনয়ে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ ও ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’র মতো মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে আহ্বান করো। [সূত্র:আনওয়ারুত্তানযীল ওয়া আসরারুত্তাবীল, ক্বাযী নাসিরুদ্দীন আবূ সাঈদ আব্দুল্লাহ বিন উমর বিন মুহাম্মদ সিরাযী- বায়যাভী, ইন্তিক্বাল ৭৯১ হিজরী, দ্বিতীয় খণ্ড,১৪৮ পৃষ্ঠা, আলমাকতাবাতুত্ তাওফীক্বীয়্যাহ]।
সপ্তম:
وقيل معناه لا تدعوه باسمه، كما يدعو بعضكم بعضاً يا محمد يا عبدالله، ولكن فخموه وعظموه وشرفوه وقولوا يا نبيّ الله يا رسول الله في لين وتواضع
এবং বলা হয়েছে যে, আয়াতের মর্ম হলো, তোমরা একে অপরকে যেভাবে ডাকো, তাঁকে তেমনি নাম ধরে ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ ‘ইয়া আব্দুল্লাহ’ ডেকো না। অধিকন্তু তাঁকে মান-সম্মান- শ্রদ্ধা- মর্যাদা- মাহাত্ম্য দিয়ে বিনয় বিনম্রতায় ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলে ডাকো। [সূত্র: লুবাবুত্তাবীল ফী মা’আনিয়ুত্তানযীল (তাফসীরুল খাযিন), আলা উদ্দীন আলী বিন মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম আলবাগদাদী – আলখাযিন (ইন্তিক্বাল ৭২৫ হিজরী), তৃতীয় খণ্ড, ৩০৭ পৃষ্ঠা, দারুল কুতুবুল ইলমীয়্যাহ, বায়রুত- লেবনান]।
অষ্টম:
(لاتجعلوا دعاء الرسول بينكم) * أي لا تدعوا الرسول بأسمه يا محمد * (كدعاء بعضكم بعضا) * اسمه ولكن عظموه ووقروه وشرفوه وقولوا له يا نبي الله ويا رسول الله
“রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের পরস্পরের মাঝে তেমন স্থির করোনা, অর্থাৎ রাসূলকে নাম যোগে ইয়া মুহাম্মাদু ডেকো না; যেমন তোমরা একে অপরকে ডাকো তার নাম ধরে। বরং তাঁকে (রাসূলকে ) সম্মান করো, শ্রদ্ধা করো এবং মর্যাদা দাও আর বলো, “ইয়া নবীয়্যাল্লাহ ও ইয়া রাসূলাল্লাহ”। [তানভীরুল মিক্ববাস মিন তাফসীরি ইবনিল আব্বাস, সংকলক:মাজদুদ্দীন আবূ ত্বাহির মুহাম্মদ বিন ইয়াক্বূব ফীরূযাবাদী , ২৯৯-৩০০ পৃষ্ঠা, দারু কুতুবিল ইলমীয়্যাহ]।
নবম:
قوله تعالى: لا تجعلوا دعاء الرسول بينكم كدعاء بعضكم بعضا فيه تحريم ندائه صلى الله عليه وسلم باسمه بل يقال: يا رسول الله ، يا نبي الله ، والظاهر استمرار ذلك بعد وفاته إلى الآن –
আল্লাহ তা‘আলার বাণী ‘ তোমাদের পরস্পরে একে অপরের আহ্বানের ন্যায় রাসূলের আহ্বানকে স্থির করোনা’ এতে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাকে নাম ধরে আহ্বানের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বরং ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ বলা হবে। এবং সুস্পষ্ট যে, ওটার (নিষেধাজ্ঞার) স্থায়িত্ব বিসালের পর অদ্যাবধি। [সূত্র: আল্ ইকলীল ফী ইস্তিম্বাতিত তানযীল, ইমাম হাফিয জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান বিন আবূ বকর আস্সুয়ূতী ( ইন্তিক্বাল: ৯১১ হিজরী)]।
দশম:
الدر المنثور — جلال الدين السيوطي (٩١١ هـ)
قَوْلُهُ تَعالى: لا تَجْعَلُوا دُعاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكم كَدُعاءِ بَعْضِكم بَعْضًا .
أخْرَجَ ابْنُ أبِي حاتِمٍ، وابْنُ مَرْدُوَيْهِ، وأبُو نُعَيْمٍ في ”الدَّلائِلِ“، عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ في قَوْلِهِ: ﴿لا تَجْعَلُوا دُعاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكم كَدُعاءِ بَعْضِكم بَعْضًا﴾ قالَ: كانُوا يَقُولُونَ: يا مُحَمَّدُ، يا أبا القاسِمِ، فَنَهاهُمُ اللَّهُ عَنْ ذَلِكَ إعْظامًا لِنَبِيِّهِ ﷺ، فَقالُوا: يا نَبِيَّ اللَّهِ، يا رَسُولَ اللَّهِ.
وأخْرَجَ أبُو نَعِيمٍ في ”الدَّلائِلِ“، عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ في قَوْلِهِ: ﴿لا تَجْعَلُوا دُعاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكم كَدُعاءِ بَعْضِكم بَعْضًا﴾ يَعْنِي كَدُعاءِ أحَدِكم إذا دَعا أخاهُ بِاسْمِهِ، ولَكِنْ وقِّرُوهُ وعَظِّمُوهُ، وقُولُوا لَهُ: يا رَسُولَ اللَّهِ، ويا نَبِيَّ اللَّهِ.
وأخْرَجَ عَبْدُ الغَنِيِّ بْنُ سَعِيدٍ في ”تَفْسِيرِهِ“، وأبُو نُعَيْمٍ في ”الدَّلائِلِ“، عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ في قَوْلِهِ: ﴿لا تَجْعَلُوا دُعاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكم كَدُعاءِ بَعْضِكم بَعْضًا﴾ يُرِيدُ ولا تَصِيحُوا بِهِ مِن بِعِيدٍ: يا أبا القاسِمِ. ولَكِنْ كَما قالَ اللَّهُ في ”الحُجُراتِ“: ﴿إنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أصْواتَهم عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ﴾ [الحُجُراتِ: ٣] .
وأخْرَجَ ابْنُ أبِي شَيْبَةَ، وعَبْدُ بْنُ حُمَيْدٍ، وابْنُ جَرِيرٍ، وابْنُ المُنْذِرِ، وابْنُ أبِي حاتِمٍ، عَنْ مُجاهِدٍ في الآيَةِ قالَ: أمَرَهُمُ اللَّهُ أنْ يَدْعُوهُ: يا رَسُولَ اللَّهِ. في لِينٍ وتَواضُعٍ، ولا يَقُولُوا: يا مُحَمَّدُ. في تَجَهُّمٍ.
وأخْرَجَ عَبْدُ الرَّزّاقِ، وعَبْدُ بْنُ حُمَيْدٍ، وابْنُ المُنْذِرِ، وابْنُ أبِي حاتِمٍ، عَنْ قَتادَةَ في الآيَةِ قالَ: أمَرَ اللَّهُ أنْ يُهابَ نَبِيُّهُ، وأنْ يُبَجَّلَ، وأنْ يُعَظَّمَ، وأنْ يُفَخَّمَ، ويُشَرَّفَ.
وأخْرَجَ عَبْدُ بْنُ حُمَيْدٍ، عَنْ عِكْرِمَةَ في الآيَةِ قالَ: لا تَقُولُوا يا مُحَمَّدُ. ولَكِنْ قُولُوا: يا رَسُولَ اللَّهِ.
وأخْرَجَ عَبْدُ بْنُ حُمَيْدٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، والحَسَنِ، مِثْلَهُ
( المكتبة الإسلامية)
আদ্দুর্রুল মানসূর, জালালুদ্দীন আস্সুয়ূত্বী, ইন্তিক্বাল: ৯১১ হিজরী।
মহান আল্লাহ তা‘আলা’র বাণী, ‘ রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের পরস্পরের একে অপরের আহ্বানের মতো গণ্য করোনা’।
ইবনু আবী হাতিম, ইবনু মারদুভীয়্যাহ ও আবূ নু‘আয়ম দালায়িলে ইবনে আব্বাস থেকে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তাঁরা ( সাহাবায়ে কিরামের) ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ ‘ ইয়া আবাল ক্বাসিম’ বলতেন, অতএব আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার সম্মানার্থে তাঁদের নিষেধ করে দেন; সুতরাং তাঁরা (সাহাবায়ে কিরাম) ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ ডাকেন।
এবং আবূ নু‘আয়ম দালায়িলে ইবনে আব্বাস থেকে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আরো বর্ণনা করেন, অর্থাৎ তোমাদের কারো আপন ভাইকে নাম ধরে ডাকার মতো স্থির করোনা, বরং তাঁকে শ্রদ্ধা-সম্মান দিয়ে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ ‘ইয়া নবীয়্যাল্লাহ’ বলে ডাকো।
এবং আব্দুল গনী বিন সাঈদ তাঁর তাফসীরে এবং আবূ নু‘আয়ম দালায়িলে ইবনে আব্বাস থেকে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন যে, আয়াতের উদ্দেশ্য হল, দূর থেকে ‘ইয়া আবাল ক্বাসিম’ বলে শোর-চিৎকার করোনা; বরং আল্লাহ সূরাহ হুজুরাতের তৃতীয় আয়াতে ‘নিশ্চয় যারা আল্লাহর রসূলের সামনে নিজেদের কন্ঠস্বর নীচু করে’ যেমন ইরশাদ করেছেন, ( তদ্মতো মৃদু স্বরে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলে ডাকো)।
এবং ইবনু আবী শায়বাহ, আব্দ বিন হুমায়দ, ইবনু জারীর, ইবনুল মুনযার ও ইবনু আবী হাতিম প্রমুখ মুজাহিদ থেকে আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বিনয়ের সাথে মৃদু স্বরে তাঁকে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ ডাকার এবং কর্কশ কন্ঠে ‘ইয়া মুহাম্মাদু’ না বলার নির্দেশ তাঁদের দিয়েছেন।
এবং আব্দুর রায্যাক্ব, আব্দ বিন হুমায়দ, ইবনুল মুনযার ও ইবনু আবী হাতিম প্রমুখ ক্বাতাদাহ থেকে আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তাঁর নবীকে মান-মর্যাদা, ভক্তি-শ্রদ্ধা, ইজ্জত-সম্মান ও মাহাত্ম্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এবং আব্দ বিন হুমায়দ ইকরামাহ থেকে আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘ইয়া মুহাম্মদ’ বলোনা, বরং ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ বলো।
এবং আব্দ বিন হুমায়দ সাঈদ বিন জুবাইর ও হাসান থেকে অনুরূপ বর্ণনা সংকলন করেছেন। [সূত্র: আলমাকতাবাতুল ইসলামীয়্যাহ]।
চলমান….
মুক্তিধারা 







