উম্মুল ফজল মণি
আশরাফুল মাখলূকাত বা সৃষ্টির সেরার মর্যাদায় স্রষ্টা কর্তৃক অভিষিক্ত মানব যখন কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে নিকৃষ্টতার প্রান্তে পৌঁছে পশু অপেক্ষা অধম হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তা’আলা মানবতার দিশারী রূপে নবী-রাসূল প্রেরণ করেন। নবী-রাসূলের প্রেরণ ধারাবাহিকতায় সর্বশেষে সর্বকালের জন্য আদর্শ মডেল রূপে প্রেরিত হন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম।
ক্বুরআনুল কারীমের সূরা আরাফ- ১৮৪নং আয়াত মর্মে এরশাদ হচ্ছে, “হে রাসূল, আপনি বলে দিন হে লোক সকল আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” এখানে সবার প্রতি বলতে তাঁর (দ.) সময়কাল থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত আগত সকলকে বুঝানো হয়েছে। পৃথিবীর শুরু থেকেই আল্লাহ তা’আলা মানবজাতিকে সৎপথ প্রদর্শন, আল্লাহর গুণে গুণান্বিত ও আল্লাহর বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করার নিমিত্তে যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবী-রাসূলের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ আগমন করলেন ইমামুল আম্বিয়া, সৈয়্যদুল মুরসালীন রহমতুল্লিল আলামীন মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামা । তাঁকে আল্লাহ সমগ্র বিশ্বের জন্য সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাঁর পর যেহেতু আর কোন নবী আসবেনা সেহেতু তাঁকেই সমগ্র বিশ্বের জন্য একমাত্র অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় মহান আদর্শরূপে নির্ধারন করেন। সার্বজনীন ও সর্বকালীন আদর্শ হবার যাবতীয় গুণাবলী যেমন সকল মানুষকে এক চোখে দেখা, সকলের কল্যাণকামী হওয়া, মানবজীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান দেয়া, নির্ভুল পথ নির্দেশনা দেয়া এবং নিজের দেয়া আদর্শ ও নীতি মালাকে বাস্তবে রূপায়ন করে দেখিয়ে দেয়া ইত্যাদি সকল গুণাবলী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সত্তায় সমাবেশিত করেন।
পৃথিবীতে তিনিই একমাত্র মহামানব যার প্রতিটি ক্ষণ, মুহূর্ত ও ঘটনা সুন্দর এবং সাবলীলভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর জীবন পদ্ধতি ও কাহিনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, তাঁর জীবন সাধারণ আর দশটা মানুষের জীবনের মত নয়। তাঁর মধ্যে ক্ষুদ্র কোন জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনা কখনো দেখা যায়নি। তিনি ছিলেন একজন মানব প্রেমিক; বিশ্ব মানবতার উদ্দেশ্যেই তার সকল বক্তৃতা-বিবৃতি নিবেদিত। তাঁর বক্তৃতা-বিবৃতি-ভাষণ সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তিনি পৃথিবীর সকল মানুষকে এক জাতি তথা মানুষ জাতি হিসেবে দেখতেন। বংশ, গোত্র, শ্রেণী, ধনী-গরীব, ছোট-বড়, সাদা-কালো, আরব-অনারব, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বলে তিনি মানুষকে বিচার করতেন না। তিনি গোটা জীবনেও এরকম একটা বক্তৃতা কখনো দেননি বা এমন কথাও বলেননি, যা দ্বারা প্রমাণিত হতে পারে যে সমগ্র মানবজাতির পরিবর্তে একটি অঞ্চলের মানব গোষ্ঠির প্রতি তাঁর প্রেম-প্রীতি সমধিক। এক কথায়, তিনি ছিলেন বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত। শান্তির বাণী নিয়ে এ ধরাধামে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করার জন্যেই তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন। পরধর্মে যেমন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পরম সহিষ্ণু, তেমনি পররাষ্ট্রের প্রতি তাঁর বাণী ছিল শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সাথে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনের উদ্দেশ্যেই তিনি বিভিন্ন রাজদরবারে দূত প্রেরণ করেন।
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের নীতিতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র নীতি হতো পরিচালিত। তিনি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ পছন্দ করতেন না। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক খোদ বখ্স বলেন, The immediate result of the Prophet’s teaching was the dissolution of the trial system and the foundation of the Brotherhood of Islam.” অর্থাৎ, “আরবের গোত্রভিত্তিক সমাজের বিনাশ ও (তদস্থলে) ইসলামের ভ্রাতৃত্ব স্থাপনই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র শিক্ষার প্রত্যক্ষ ফল।” তিনি শুধু গোত্রভিত্তিক সমাজের বিনাশ সাধন করেননি, বিশ্বের মধ্যে বসবাসকারী সকল শ্রেণীর লোককে একাত্মবোধে অনুপ্রাণিত করে এক মহান আদর্শ, উদ্দেশ্য ও গন্তব্যের পথে পরিচালিত করেন। এরূপে ঈমান ও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরববাসী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র বলিষ্ঠ নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করেন। P.K. Hitti তার History of the arabs গ্রন্থে লিখেন. “Out of religious community of Al-Madinah the Later and Larger state of Islam arose.” অর্থাৎ, “মদীনার ধর্মভিত্তিক সমাজ হতে উত্তরকালে বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।” তিনি মানবজাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গোটা জীবন অবিরত সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন। আজ পৃথিবীর দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার যে গুঞ্জরণ শোনা যায়, বিশ্ব সংঘ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, চৌদ্দশ বছর পূর্বেই তা কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম মানবজাতিকে শিখিয়েছেন। তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণ সার্বজনীন মানবাধিকার বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত ছিল।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র জীবনের এই শেষ ভাষণ বিশ্ব মানবাধিকার সনদ তো বটেই, অধিকন্তু এটা বিশ্বজনীন বা সার্বজনীন ভালবাসার বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তাঁর এই বক্তৃতার পরতে পরতে তাঁর বিশ্বজনীন প্রেমই স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে।
তিনি কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্যের অনন্য উদাহরণ। তিনি যা বলেছেন তা তাঁর জীবনেই অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তিনি শুধু কাল্পনিক বা বাচনিক আদর্শের কথা, নীতি কথা বলেই ক্ষান্ত হননি বরং তাঁর প্রদত্ত নীতিমালা ও আদর্শের আলোকে একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামা যে মদীনা রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েছিলেন, তার দিকে তাকালেই স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় যে, তিনি শুধু বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমেই তাঁর আদর্শ ও নীতিমালা প্রচার করেন নি। বরং তাঁর জীবনেই তার সফল বাস্তবায়ন করেছেন। এজন্যই আমরা দেখতে পাই তাঁর ইহলৌকিক জীবনকালেই আরবদের মত হাবশী, ইরানী, রোমক, হিজাজীয় এবং ইসরাইলিরাও সহকর্মী ও সহযোগী হয়। আর তাঁর ইন্তিকালের পর বিশ্বের পর বিশ্বের প্রতিটি অঙ্গনে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শের বিস্তার ঘটে বিদ্যুৎ গতিতে। যারাই একবার তাঁর এ আদর্শের পরশ পেয়েছে, তারাই তাঁর আদর্শকে নিজেদের আদর্শরূপে আর এই আদর্শ মডেল মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের মনিব হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম কুরআনের আলোকে মানব-জীবনের মৌলিক সমস্যার যে সমাধান দিয়েছেন, তাও তাঁকে সার্বজনীনতা এনে দিয়েছে। তাঁর দেয়া সমাধান ছিল সম্পূর্ণ নির্ভূল। সমাধানের এই নির্ভূলতার জন্যই আরব ভূ-খণ্ডে অতি অল্প দিনেই তিনি একটি মহান সভ্যতার আলো প্রজ্জ্বলিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মানবীয় জাগতিক সমস্যা সমাধান সঠিক ছিল বলে দলে দলে লোক তাঁর কাছে ভীড় জমিয়েছিল। আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল প্রদর্শিত এ সমাধানের আলোকে যে সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে মানুষ তার সকল ধরণের অধিকার নিয়ে জীবনযাপন করতেন। কেউ কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করতো না। চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই ছিল অকল্পনীয়। খুন-খারাবী, ব্যাভিচার চিরতরে সমূলে উৎখাত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ন্যায় ও নিষ্ঠাবান সমাজ। সেখানে প্রতারণা, ঠকানো, জোচ্চুরি ছিল না। সেখানে ধনী আরো ধনী হয়ে অর্থের পাহাড় বানাতে পারেনি। পক্ষান্তরে গরীবরা ও দিনে দিনে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। নারী তার ইজ্জত ও সম্ভ্রম নিয়েই বেঁচেছিল পূর্ণস্বাধীনতায়। সানা থেকে হাজরা-মাওত পর্যন্ত নারীরা একাকী কিংবা দলবদ্ধ হয়ে গমনাগমনে নিজের আব্রু নিয়ে নিঃসংকোচ নির্ভয় থাকতে পেরেছিল। তাতে এতটুকু বিপদ কিংবা রাহাজানির ভয় তাদের মনে আসেনি। শুধু কি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠেই বলেছিলেন, “আমার খেলাফত কালে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মরে তবে কিয়ামতের ময়দানে আমাকে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং জীবন সমস্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামা প্রদর্শিত সমাধান শুধু মানুষের সমস্যার সমাধান দেয়া হয়নি পশু-পাখিসহ চতুষ্পদ জন্তু জানোয়ারের সমস্যা মেটানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামা’র দেয়া বা প্রদর্শিত সমাধান দেড় হাজার বছর পূর্বে যতটা বিশুদ্ধ সঠিক ও কার্যকর ছিল, ততখানি আজও আছে। আজও সঠিকভাবে মানুষের জাগতিক, আত্মিক ও পারলৌকিক সমস্যার সমাধান দিচ্ছে অব্যাহত ভাবে। এক কথায় কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামা’র প্রদর্শিত জীবন দর্শন মানুষের সমস্যার সুষ্ঠু ও সঠিক সমাধান দিয়েই যাবে।
সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামা প্রদর্শিত পথ চিরন্তন সত্য ও কার্যকর। সর্বকালের ও সর্বযুগের সমস্যা নিরসনে রহমতুল্লিল আলামীনের আদর্শ চৌদ্দশ বছর আগে যেমন কার্যকরী ছিল আজও তা সমভাবে প্রযোজ্য এবং কিয়ামত পর্যন্ত নির্ভুল সমাধান দিতে সক্ষম।
পতন যুগে অধুনা বিশ্বকে ধ্বংস ও সংঘাতের অতল গহ্বর হতে উদ্ধার নিমিত্তে তাঁর আদর্শের অনুসরণ-অনুকরণই একমাত্র উপায় হতে পারে। কেননা তিনিই একমাত্র স্রষ্টা মনোনীত আদর্শ মডেল, তাঁর দেওয়া জীবন দর্শনই নির্ভুল-নির্ভেজাল ঐশী জ্ঞান প্রসূত।
মহান রাব্বুল আলামীনের মহাবাণী “ওয়া লাক্বাদ কানা লাকুম ফি রাসূলিল্লাহি উস্ওয়াতুন হাসানাতুন”। অর্থাৎ “এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামা’র মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ”। সুতরাং বলতে পারি, এ আদর্শ অনুসরণ অনুকরণের মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান, ইহলৌকিক শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তি আসবে।
মুক্তিধারা 







