মুর্শিদে করীমের একটি কারামত ও ত্বরীকতের ব্যবহারিক শিক্ষা

মাওলানা মুহাম্মদ নূরুল আবছার হারূনী
একদা ঈদুল ফিতর দিবাগত রাত আনুমানিক দশটার দিকে পূর্ব ফটিকছড়ি গ্রামের সুলতান আহমদ ( ভোলা) সওদাগর বাড়ির লজিং হতে মাহফিলে যোগদানের জন্য বাবাজানের বাড়ির উদ্দেশ্য বের হই। দু’তারিখের কচি চাঁদ অনেক আগেই অস্ত গিয়েছে। গুটিগুটি বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তাঘাটে জনমানবের চিহ্নও নেই। আমি হাফেজ আহমদ কবির সাহেবের বাড়ির দক্ষিণ পার্শ্বস্থ পুকুরের অগ্নিকোণের সামান্য পূর্বে রাস্তায় ওঠিতেই দেখি, পশ্চিম দিক হতে একটি লাল কুকুর আমার দিকে আসছে। কুকুরটিকে বললাম, কোথায় যাচ্ছ? দাঁড়াও। অমনি কুকুরটি দাঁড়িয়ে লম্বা আর উঁচু হতে লাগল। দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম। সাহায্যের জন্য ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলে আর্তনাদ করে ওঠলাম। কিন্তু না কুকুরটি পূর্ববৎ উঁচু আর লম্বাই হচ্ছে। আমি ‘ইয়া গাউসুল আ’যম জিলানী’ বলে ডাক দিলাম। এবারও আমাকে নৈরাশ হতে হল। কুকুরের বাড়ন্ত অবস্থা আগের মতই বহাল রইল। এবার আমি ‘ইয়া গাউসুল আ’যম মাইজভাণ্ডারী’ বলে চিৎকার দিলাম। কুকুর তখনও বৃহৎ হচ্ছে, তার মুখ আমার মুখ ছুঁইছুঁই হয়েছে। আমি দিশাহারাপ্রায় হয়ে ‘ইয়া মুর্শিদ মাওলা’ বলে বিকট আওয়াজ দিলাম। অমনিই কুকুরটি বাঁক খেয়ে পূর্বের মতো স্বাভাবিক হয়ে পালাতে সচেষ্ট হল। আমার বুকে প্রবল সাহস সঞ্চারিত হল। আমি কুকুরটিকে বললাম, পালাচ্ছ কেন? দাঁড়াও। সে না দাঁড়িয়েই রাস্তার পাশ দিয়ে মন্থর গতিতে চলে গেল। আমি মুর্শিদ মাওলার আস্তানা শরীফের দিকে যাত্রা দিলাম।
এখানে আমাকে এ শিক্ষাই দেওয়া হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (দ.), গাউসুল আ’যম শাহানশাহে বাগদাদ (রা.) ও গাউসুল আ’যম শাহানশাহে মাইজভাণ্ডার (রা.) উদ্ধার করতে পূর্ণ সক্ষম হলেও আমাকে তাঁদের সাহায্য পেতে হবে আমার মুর্শিদের মাধ্যমেই। পিতা সকলের আবুল বশর হযরত আদম (আ.) হলেও যার সাথে সর্বাধিক নিকটতর সম্পর্ক রয়েছে, তিনিই পিতা; তাঁরই মালিকানার উত্তরাধিকারী হওয়া চলবে। বরং আপন পিতার মধ্যস্থতায় দাদা পর দাদা যত উর্ধ্বেরই হোক মিরাছ পাওয়া যাবে। পরন্তু পিতার মাধ্যম ছাড়া কোন পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার পাওয়া যাবেনা।
আল্লাহ পাক সর্বশক্তিমান। তিনি নরনারী ছাড়া মানব সৃজন করেন। যেমন- হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। নারী ব্যতীত হযরত হাওয়া (আ.)কে আর পুরুষ ব্যতীত হযরত ঈসা (আ.)কে সৃষ্টি করেছেন। পরন্তু ওই পরিপূর্ণ কুদরত সত্ত্বেও ওই সুনিপুণ স্রষ্টা প্রজননে নারী-পুরুষের মিলন প্রক্রিয়াকে আবশ্যক করে রেখেছেন। বিনা মাধ্যমে সৃষ্টি করে আপন কুদরত প্রকাশ করেছেন যে, আমি এটার শক্তি রাখি তবে আমার পছন্দনীয় রীতি হল, নর-নারীর মিলন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টির প্রসার। একটি কালো কাপড় খণ্ড নিয়ে যতই উপরে উত্তোলন করোনা কেন, তাতে আগুন লাগবেনা। কিন্তু আতশী আয়না মধ্যখানে ধরলে সূর্য থেকে যতই দূরেই হোক, আগুন ধরবেই। নিজেকে কালো কাপড় খণ্ড আর ওই বে-মিছাল স্রষ্টাকে সূর্য এবং অনুসৃত গুরুকে আতশী আয়না জ্ঞান করতে হবে। আল্লাহ বিনা মাধ্যমে আপন নিয়ামত দানে পূর্ণসমর্থ হলেও মাধ্যমে প্রদানই তাঁর রীতি। ‘ওয়া লন তাজিদা লি-সুন্নাতিল্লাহি তাবদীলা’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর রীতিতে কখনো পরিবর্তন পাবেনা’। যেমন কা’বা উপাসক ও উপাস্যের মধ্যকার সংযোগ মাধ্যম, অনুরূপ পীর-মুর্শিদ প্রকৃত পথ প্রদর্শক আল্লাহ ও পথিক মুরিদের মধ্যখানে সংযোগ মিডিয়া।
মাধ্যম বাদ দিয়ে সরাসরি আল্লাহ থেকে লাভের আশা দুরাশাই মাত্র। কথিত আছে যে, একদা হযরত জুনায়িদ বাগদাদী (রা.) দিজলা নদীর তীরে এসে ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে নদীর ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তার পিছু পিছু এক লোকও এসে উপস্থিত হয়। তারও নদী পারের দরকার ছিল কিন্তু নদীতে কোন নৌকা নেই। অবশেষে সে জুনায়িদ (রা.)কে পানির ওপর চলতে দেখে আরয করলেন, আক্বা! আমি কী করে আসি। জুনায়িদ (রা.) বললেন, হে জুনায়িদ! হে জুনায়িদ! বলে চলে এসো। সে তা-ই করল। নদীর মধ্যভাগে পৌঁছলে শয়তান কুমন্ত্রণা দিল যে, হযরত নিজেতো ‘ইয়া আল্লাহ’ জপছেন আর আমাকে ‘ইয়া জুনায়িদ’ জপাচ্ছেন; আমিও ‘ইয়া আল্লাহ’ ই কেন বলছিনা। অতএব সেও ‘ইয়া আল্লাহ’ বলতে শুরু করল আর অমনিই তলিয়ে যেতে লাগল। ডাক দিয়ে বলল, হযরত আমাকে উদ্ধার করুন। তিনি বললেন, পূর্ববৎ বলো। অতঃপর লোকটি ‘ইয়া জুনায়িদ’ জপতে জপতে পার হয়ে গেল।
জুনায়িদ (রা.)’র খেদমতে জিজ্ঞাসা করল, আক্বা! এ কি ব্যাপার যে, আপনি ‘ইয়া আল্লাহ’ বল্লে পার হোন আর আমি বল্লে ডুবে যাই! প্রত্যুত্তরে জুনায়িদ (রা.) বললেন, হতমূর্খ! আজও জুনায়িদ পর্যন্তই-তো পৌঁছনি, আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছা কি করে হবে!
পরিতাপের বিষয় যে, বহু শিক্ষিত মূর্খ মাধ্যম মানা-তালাশ করা র্শিক ফতওয়া দিয়ে নিজের অজান্তেই তলিয়ে যাচ্ছে। আর কিছু নির্বোধ আজ এক শায়খের আর কাল অন্য শায়খের ভক্ত হয়ে সর্বদা বঞ্চিত হয়ে চলছে। কেননা কোন শায়খই এ ধরনের লোকের প্রতি দিল-অন্তরে মনোযোগী হয়না। অন্তরের মনোযোগ পায়না বলেই সদা-সর্বদা বঞ্চিত থাকে। মূলত: শায়খে মুকতাদা বা অনুসৃত গুরু মুরাদ বা উদ্দেশিত একজনই হওয়া চায়। যে ব্যাক্তি একজনের নিকট গৃহীত  সে সকলের নিকটই গৃহীত, যে একজনের নয়, সে কারো নয়। কেননা আউলিয়ারা সবে মিলে এক। আল্লামা মকবুল কাঞ্চনপূরী (রা.) বলেন,
আউলিয়া জুমলাহ বহ তাহকীক য়কতনান্দ ওয়া বেশ নে;
খাহ সগে শাহে মাইজভাণ্ডার খাহ শাহে বাগদাদ বাশ।

Sharing is caring!

১ thought on “মুর্শিদে করীমের একটি কারামত ও ত্বরীকতের ব্যবহারিক শিক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *