মীলাদে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার আনন্দ ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

✒ মাওলানা নূরুল আবছার হারূনী
মীলাদে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র মর্যাদা মাহাত্ম্য কারো অজানা নয়; যদিও হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার অনলে বিদগ্ধ কতেক নাম সর্বস্ব মুসলিম জ্ঞানপাপী বিদ্‘আতের ধোঁয়া তুলে। বিতর্ক ও তদুত্তরে লম্বা-চওড়া আলোচনার প্রবৃত্তি আমার নেই। এ পুণ্যকাজের ফযীলত-বরকত প্রসঙ্গে সুপ্রসিদ্ধ একটি ঘটনার অবতারণা ও বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য।
কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বর্ণনা মতে সাব্যস্ত যে, কাফিরদের সমস্ত পুণ্যকাজ হাওয়ায় উড়ে যায়। নেক কাজের কোন সুফলই পরকালে তারা পায়না। বরং পুণ্যকাজের বিনিময় পার্থিব জীবনেই প্রদত্ত হয়। পরকালে পুণ্যকাজের বিনিময় পাওয়ার যোগ্য কেবল মুসলিমরাই। কেননা আল্লাহর নিকট ভাল কাজের বিনিময়ের হেতু হল ঈমান। এটি ইসলামী শরীয়তের সর্বজন গ্রাহ্য মূলনীতি; যা অস্বীকার করা চলেনা। এবার সহীহ বুখারী শরীফের ওই বর্ণনার প্রতি মনোনিবেশ করুন, যাতে কট্টর কাফির আবু লাহাব প্রসঙ্গে বিবৃত হয়েছে যে, মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র খুশির প্রতিদান থেকে আল্লাহ তাকেও বঞ্চিত করেননি। অথচ আবু লাহাব এমন বদবখ্ত যে, আল্লাহ পাককালামে তার নিন্দায় পুরো সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আবু লাহাবের দু’হাত ভেঙ্গে গিয়েছে এবং সে স্বয়ং বিধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তার সম্পদ তার কোন কাজে আসেনি, না তার উপার্জন (তাকে উপকৃত করেছে)। অচিরেই শিখাময় আগুনে তাকে নিক্ষেপ করা হবে।’ (১১১নং সূরা ১-৩ নং আয়াত)
রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র বিলাদত সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর বর্ণনা সম্বলিত হাদীসসমূহে রয়েছে যে, আবু লাহাবের সুওয়াইবাহ নামক এক দাসী ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র ধরাধামে আবির্ভাব মুহূর্তে সে তাকে হযরত সৈয়্যিদাহ আমিনা (রা.)’র গৃহে পাঠাল যে, ‘যাও! আমার ভাই আব্দুল্লাহর ঘরে সন্তান প্রসব হওয়ার আছে, তুমি আমার ভ্রাতৃবধু আমিনার সেবা-যত্ন কর’। সৈয়্যদে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র শুভাগমন হলে সুওয়াইবাহ দৌঁড়ে গিয়ে আবু লাহাবকে বলল, ‘মনিব! আপনাকে মোবারকবাদ, আজ আল্লাহ আপনার মরহুম ভাইয়ের ঘরে পুত্র সন্তান দান করেছেন’। ভাতিজার জন্মের খুশিতে আবু লাহাব এতই সন্তুষ্ট হল যে, যে অবস্থায় বসা ছিল, ওই অবস্থাতে আপন হাতের দু’টি আঙ্গুল দ্বারা ইঙ্গিত করে বল্ল, “সুওয়াইবাহ! যাও, আমি নবজাতকের জন্মের আনন্দে তোমাকে মুক্ত করে দিলাম”।
এবার বুখারী শরীফ কিতাবুন নিকাহ বাবু ওয়া উম্মুহাতুকমুল্লাতী আরদ্বা’নাকুম এর বর্ণনা লক্ষ্য করুন। ‘আবু লাহাব যখন মারা গেল, তখন তার পরিবারের কেউ তাকে মন্দ অবস্থায় স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছো? প্রত্যুত্তরে আবু লাহাব বলল, বড়ই  আযাবে আছি; যা থেকে রেহাই মিলছেনা। হ্যাঁ অবশ্য (নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র মীলাদের আনন্দে) সুওয়াইবাহকে আযাদ করার কারণে কিছু তৃষ্ণা নিবারিত করা হয়’।
বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফতহুল বারী প্রণেতা ইবনে হাজর আসকালানী ওই ঘটনা এ রূপ বর্ণনা করেন, হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আবু লাহাব মরে গেলে এক বছর পর আমি তাকে স্বপ্নে বড় খারাপ অবস্থায় দেখলাম। সে বলল, তোমাদের বিচ্ছেদের পর স্বস্তির নাগাল পায়নি; পরন্তু প্রতি সোমবার আমার শাস্তি লঘু করে দেওয়া হয়। এ হালকাকরণ এ জন্য যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা সোমাবার জন্ম গ্রহণ করেন; আর সুওয়াইবাহ ওই দিন তাকে ওই সংবাদ দিলে সে তাকে আযাদ করে দিয়েছিল’।
জামেউল উসূল প্রণেতা ইমাম আব্দুর রহমান শায়বানী লিখেছেন, ‘আবু লাহাবের শাস্তি হালকা করাটা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র মার্যাদা মাহত্ম্যের কারণেই, তার দাসী আযাদ করা হেতু নয়; যেমন আবু তালিবের শাস্তি হালকা করা হয়। কেননা কাফিরদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার বাণী, ‘এবং বিনষ্ঠ হয়ে গিয়েছে ওই সব (কর্ম সমূহ পরকালীন বিনিময়ের হিসাবে), যা তারা দুনিয়ার বুকে আঞ্জাম দিয়েছিল আর তারা যা করতে আছে, তা বাতিল’।
উক্ত বর্ণনা মতে সুষ্পষ্ট যে, আল্লাহ এটা দেখেননা যে, আমলকারী কে, বরং তিনি এটাই চান যে, আমল কার জন্য করেছে। আমলকারী কট্টর কাফির আবু লাহাব ছিল, তার সাথে আল্লাহর সম্বন্ধ নেই, তাকে পুরস্কৃত করা আল্লাহর উদ্দেশ্যও নয়, পরন্তু তার কাজটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্য; তাতেই সে পুরস্কৃত হয়ে গেল, কেননা আল্লাহর সমূহ দয়া-করুণা-মেহেরবানী আপন মাহবূবে আকরম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র কারণেই।
বুখারী শরীফের হাদীস ও পূর্বোক্ত আলোচনায় এ কথা প্রমাণিত হল যে, অজ্ঞাতসারে মীলাদের খুশি উদযাপনকারী কুখ্যাত কাফিরকেও আল্লাহ ওই পুণ্যকাজের বিনিময় দিচ্ছেন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত দিতে থাকবেন। এ-ও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এটি শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র সাথে সংযুক্ত কর্মকাণ্ডেরই বিশেষত্ব যে, যদি কাফিরও কোন আমল করে তবে সে প্রতিদান-যোগ্য হবইে।
একদিকে-তো এ হাকীকত উদ্ভাসিত যে, হুযূর নবী আকরম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র জন্য করা অতি সাধারণ কাজও আল্লাহর দরবারে প্রতিদানের কারণ; হোকনা তা কাফিরেরও। আর অপরদিকে কুরআনে হাকীমের একটি আয়াত আমাদের বলছেন যে, মু’মিন সারা জীবন অগণিত পুণ্যকাজ করতে রইল; যদি তার থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র প্রতি টুকু বেয়াদবী প্রকাশ পেল, তবে মু’মিন হওয়া সত্ত্বেও জীবনের সকল পুণ্যকাজ বিনাশ হয়ে যাবে।
ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমাদের আওয়াজ (আমার মাহবূব) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র আওয়াজ অপেক্ষা উঁচু করোনা, এবং তাঁর সম্মুখে উচ্চৈ:স্বরে কথা বলোনা, যেমন তোমরা পরষ্পর উচ্চকণ্ঠে বলে থাক’।
সাহাবায়ে কিরামকে হুশিয়ার করা হচ্ছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র দরবার সাধারণ কোন দরবার নয়। সাহাবায়ে কিরামকে বারগাহে রিসালতে হাযেরীর ওই আদব শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে যে, পূর্ণ সতর্কতায় আপন আওয়াজ অনুচ্চ রাখ এবং পরস্পরের কথোপকথনের মত স্বর এত উঁচু করোনা যে, তা রাসূলের সদাহাস্য পুষ্পকোমল ওষ্ঠ নির্গত মিষ্ট বচন অপেক্ষা উঁচু হয়ে যায়। স্বয়ং আল্লাহ আপন মাহবূবের দরবারের এ আদবই শিক্ষা দিচ্ছেন, অন্যথায় স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, আমার সতর্কবাণী সত্ত্বেও যদি না বুঝো আর অসতর্ক থেকো তবে শুন, ‘তোমাদের বেখবরে, যেন আমলসমূহ বিনষ্ঠ হয়ে না যায়’।
এখানে না সুন্নাত, না তৌহীদ, না নবূয়ত-রিসালত ও আখিরাত অস্বীকারের কথা, না নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাতের অবাধ্যতার আলোচনা, কিছুই নয়, বেশ শুধু আওয়াজ এত চড়া বের হয়ে গেল যে, তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র আওয়াজ অপেক্ষা বড় হয়ে গেল, তাতেই পুরো যিন্দেগীর সমস্ত পুণ্যকাজ বিধ্বংস-বরবাদ করে দেওয়ার ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
এবার উভয় দিক মিলিয়ে এ ধারণা ধ্যান-জ্ঞানে বদ্ধমূল করে নেওয়া চায় যে, যদি মু’মিন সহস্র পুণ্যকাজ করে, আর অসতর্কতায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র প্রতি কোন তুচ্ছ ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেয়ে যায়, তবে পরকালে যাবতীয় আমলের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করে দেওয়া হবে। আর যদি কোন কাফির; তৌহীদ, রিসালত ও আখিরাতের অস্বীকারকারী ইসলামের শত্রুও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র মীলাদের খুশিতে নবী আকরম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র সম্মানে অজ্ঞাতে কোন একটি কাজও করে বসে, তবে আখিরাতে তাকে তার প্রতিদান দেওয়া হয়। 
প্রমাণ হল যে, সকল ফরয ডালপালাই;
দ্বীন-মূলে দাসত্ব কেবল ওই মহারাজেরই। 
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র প্রেম-ভালবাসায় করা হলেই আমল গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদান্বিত হবে, অন্যথায় তা পরিত্যক্ত। অন্তর নবী করীম রউফুর রহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র প্রেম-ভালবাসা শূন্য হলে তবে কোন পুণ্যকাজই সাওয়াব যোগ্য হবেনা। সূফী কবি কতইনা সুন্দর বলেছেন, 
‘যে না জানে প্রেমের মর্ম কিবা তার ধর্ম-কর্ম;
বিফল তার ঘোরা-ফিরা কাবা কাশী বৃন্দাবন।
শরীয়তে নীতি শিক্ষা, ত্বরীকতে প্রেমের দীক্ষা;
বিনা প্রেমে রীতিনীতি তপজপ অকারণ’।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *